দেশের ডেইরি খাতের সমস্যা-সম্ভবনা ও করণীয়।

- নিউজ প্রকাশের সময় : ১১:৩২:২২ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১১ নভেম্বর ২০২৪ ৬২ বার পড়া হয়েছে

বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে ডেইরি খাত। বাংলাদেশেও এ খাতটি ব্যাপক সম্ভাবনাময়। তবে এই খাতে সফলতা অর্জনে একদিকে যেমন সম্ভবনা রয়েছে তেমনি রয়েছে নানাবিধ সমস্যাও। দেশে দুধের উৎপাদন বাড়লেও মাথাপিছু প্রাপ্যতা এখনো অনেক কম। নিশ্চিত হয়নি খামারিদের উৎপাদিত দুধের নায্যমূল্যও। এছাড়া বাজারে নিম্নমানের আমদানিকৃত গুঁড়ো দুধের আধিক্যের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশি উদ্যোক্তারা। পাশাপাশি রয়েছে বিদেশি বৃহৎ কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী বিনিয়োগের প্রভাব। খামারিদের দুধে ভ্যালুচেইন সমস্যা ও গো-খাদ্যের চড়া দামের মতো সংকটও ঘিরে আছে এ শিল্পের আষ্টেপৃষ্ঠে। দেশের মোট জনসংখ্যার ২০ শতাংশ প্রত্যক্ষ এবং ৫০ শতাংশ পরোক্ষভাবে প্রাণিসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। বিষয়টি মাথায় রেখে দেশে দুধ এবং প্রাণিজ আমিষের চাহিদা পূরণে বিভিন্ন উদ্যোগ ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
বাড়ছে দুধের চাহিদাঃ
দেশে মানুষের তরল দুধ পানের অভ্যাস সেভাবে তৈরি হচ্ছে না, তবে দিন দিন তরল দুধের চেয়ে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে হলে এ শিল্পের সংকট মোকাবিলা করাও প্রয়োজন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে গত এক যুগে দুধের উৎপাদন প্রায় তিনগুণ বেড়েছে। তারপরও চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। মাথাপিছু দুধ পানও কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে কম। আবার দিন দিন বাড়ছে দুধের দামও।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে দুধ উৎপাদনের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ লাখ ৭০ হাজার টন। পরের তিন অর্থবছরে তা বেড়ে ৭২ লাখ মেট্রিক টন ছাড়িয়ে যায়। তবে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন এক লাফে ২০ লাখ মেট্রিক টন বেড়ে পৌছে যায় ৯২ লাখ মেট্রিক টনে। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুধের উৎপাদন হয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ ৬৮ হাজার টন। তবে রেকর্ড উৎপাদনেও দুধের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। কারণ, দেশে বছরে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৬৮ হাজার টন দুধের চাহিদা রয়েছে। দেশের মানুষ এখন মাথাপিছু দৈনিক গড়ে ২২২ মিলিলিটার দুধ পান করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী, একজন মানুষের দৈনিক গড়ে ২৫০ মিলিলিটার দুধ পান করা উচিত। তবে বাংলাদেশের মানুষ তার চেয়ে কম দুধ পান করে।
দুধ উৎপাদনে ব্যয়ের অধিকাংশ যায় পশুর খাদ্য ক্রয়ে:
এক লিটার দুধ উৎপাদনে যে ব্যয় হয়, তার ৭০ শতাংশই যায় পশুর খাদ্য কেনায়। এর বাইরে শ্রমমূল্য ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ও রয়েছে। মাত্র চার বছর আগেও গো-খাদ্যের দাম বর্তমান দামের চেয়ে প্রায় অর্ধেক ছিল। এখন মাসে মাসে গো-খাদ্যের দাম বাড়ায় সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। এমনকি গো-খাদ্যের দাম দফায় দফায় বাড়ায় অনেকে খামার গুটিয়ে নিয়েছেন। এক্ষেত্রে সরকারের কাছে বিনা মূল্যে ঘাসের বীজ ও চিকিৎসা খরচসহ খামার পর্যায়ে প্রণোদনা প্রয়োজন বলে মনে করছে খামারিরা। খড় ও ঘাসের পাশাপাশি গরু-ছাগলকে ভুসি, চালের খুদ, ধানের কুঁড়া এবং বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি দানাদার খাদ্য খাওয়ানো হয়। গত কয়েক মাসে প্রতি কেজি গমের ভুসিতে ৬ টাকা, বুটের খোসায় ১০ টাকা, চালের খুদে ৬ টাকা ও দানাদার ফিডে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে চার বছর আগের তুলনায় এখন ফিডের দাম দ্বিগুণ হয়েছে। এছাড়া তিন মাস আগে প্রতি কেজি গমের ভুসির দাম ৪৬ টাকা, বুটের খোসা ৫২ টাকা, চালের খুদ ২৯ টাকা ও দানাদার ফিডের দাম ৪৯ টাকা ছিল। কিন্তু এখন প্রতি কেজি গমের ভুসি ৫২ টাকা, বুটের খোসা ৬২ টাকা, চালের খুদ ৩৮ টাকা ও দানাদার ফিড ৫৫ টাকা হয়েছে।
গাভির উৎপাদন ক্ষমতা কম:
দেশে দুধের উৎপাদন কম হওয়ার পেছনে গাভির কম উৎপাদন ক্ষমতা একটি বড় কারণ। দেশে একটি গাভি গড়ে বছরের ৩০৫ দিনে দৈনিক ৮ থেকে ১০ লিটার দুধ দেয়। অথচ শীতপ্রধান দেশে একটি গাভির দৈনিক দুধ দেওয়ার পরিমাণ ২২ থেকে ৩০ লিটার পর্যন্ত।
তথ্য বলছে, ভালো মানের একটি গাভি দৈনিক গড়ে ৬২ লিটার পর্যন্ত দুধ দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিটি গরু দৈনিক গড়ে ৫২ লিটার দুধ দেয়। বাংলাদেশের খামারগুলোতে প্রতিটি গরু দিনে ৫ থেকে ৬ লিটার দুধ দেয়। এর বাইরে যেসব গরু আছে, সেগুলো দৈনিক গড়ে ২-৩ লিটার দুধ দেয়। দেশের গাভিগুলোর দুধ কম দেওয়ার কারণ হিসেবে
বলা হচ্ছে, দেশের গাভিগুলো অনেক সময় মানসম্মত খাবার পায় না। এজন্য এগুলোর উৎপাদন ক্ষমতাও কম।
দেশীয় ঘাসে প্রোটিনের পরিমাণ অপেক্ষাকৃত কম। উন্নত ঘাসের জন্য বিকল্প চাষাবাদে অনেক খামারি আগ্রহী হচ্ছেন। তবে এক্ষেত্রে জমির প্রাপ্যতা একটি বড় সমস্যা।
দুগ্ধজাত পণ্য ও গুঁড়ো দুধের চাহিদা বাড়ছে:
দেশে তরল দুধের পাশাপাশি বাড়ছে দুগ্ধজাত পণ্যের চাহিদা। এক জরিপে দেখা গেছে, বয়স্কদের মধ্যে দুধ পানের অভ্যাস আছে। তবে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের মধ্যে দুগ্ধজাত নানা পণ্য যেমন দই, মিষ্টি, লাবাং খাওয়ার প্রবণতা বেশি। মিল্ক ভিটা প্রতিদিন খামারিদের কাছ থেকে দুই লাখ ৩০ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার লিটার দুধ ব্যবহার হয় গুঁড়ো দুধ তৈরিতে। বাকি এক লাখ লিটারের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০ হাজার লিটারে পাস্তুরিত তরল দুধ করা হয়। বাকিটা দিয়ে তৈরি হয় নানা পণ্য। দুগ্ধশিল্প খাতে বড় বিনিয়োগ করেছে প্রাণ, ব্র্যাক, আকিজ, এসিআই, ইগলু, ফার্ম ফ্রেশ, আড়ংসহ বেশকিছু কোম্পানি। যদিও চাহিদার বড় অংশই পূরণ হয় আমদানি করা গুঁড়ো দুধ দিয়ে। দেশির চেয়ে বিদেশি গুঁড়ো দুধের বাজার তিনগুণ বড়। যেটি এ শিল্পের বিকাশে বড়
প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করা হয়।
ডিজিটাইজেশনের বাইরে ক্ষুদ্র খামারিরা:
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে রেজিস্টার্ড গবাদি পশুর মোট খামারের সংখ্যা ৭৯ হাজার ৫৮১টি। এর মধ্যে গাভীর খামার ৬৯ হাজার ৮৩৯, মহিষের খামার ৫১, গরু হৃষ্টপুষ্টকরণ খামার ৬১৯, ছাগলের খামার ৫ হাজার ১২৪ এবং ভেড়ার খামার ৩ হাজার ৯৪৮টি। খামারগুলোকে আবার ছোট, বড় ও মাঝারি তিন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে। যেসব খামারে ১০ থেকে ২০টি গরু আছে সেগুলো ছোট খামার, ২১ থেকে ৫০টি গরুর খামারকে মাঝারি এবং এর অধিক সংখ্যক থাকলে সেগুলোকে বড় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু ক্যাটাগরিতে প্রান্তিক তথা ক্ষুদ্র খামারিদের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
অধিদপ্তরের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি উন্নয়ন প্রকল্পের (এলডিডিপি) সর্বশেষ জরিপ অনুসারে সারাদেশে ৬১ জেলা (তিন পার্বত্য জেলা বাদে) থেকে ৭২ লাখ খামারির যে তথ্য সংগ্রহ করেছে, তাতে দেখা গেছে এক থেকে পাঁচটি গরু আছে, এমন খামারের সংখ্যা ৯০.২৫ শতাংশ, ছয় থেকে ১০টি গরু আছে, এমন খামারের সংখ্যা ৭.৭৯ শতাংশ, ১১ থেকে ২০টি গরু আছে, এমন খামারের সংখ্যা ১.৬৩ শতাংশ এবং ২০-এর বেশি গরু আছে, এমন খামারের সংখ্যা শূন্য দশমিক ৩৩ শতাংশ। এ হিসাবে দেখা গেছে, দেশে ৯৮.০৪ শতাংশ খামারিই ক্ষুদ্র। খামারের এই বিশাল অংশই উন্নত প্রযুক্তি ও ডিজিটাইজেশনের বাইরে। এসব খামারে পুরনো পদ্ধতিতে গবাদিপশু লালনপালন হচ্ছে।
সমন্বিত বিপণনব্যবস্থা ও প্রচারণার অভার:
বর্তমানে দুধ বাজারজাতকরণের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমন্বিত বিপণনব্যবস্থা নেই। এখনো পর্যাপ্ত পরিমাণে মানসম্পন্ন দুধ পাচ্ছি না। দুধে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ বেশি। আন্তর্জাতিক নিয়ম হলো, প্রতি মিলি দুধে সর্বোচ্চ ২ লাখ ব্যাকটেরিয়া থাকতে পারবে। বাংলাদেশে প্রতি মিলি দুধে ব্যাকটেরিয়ার পরিমাণ ২০ লাখের বেশি। এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
দুধ জনপ্রিয় করার জন্য প্রচারণার অভাব রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রচার করা হচ্ছে। বিদেশ থেকে তরল দুধ আমদানি করা কঠিন। তাই স্থানীয় পর্যায়ে দুধ উৎপাদন করে এ চাহিদা মেটাতে হবে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর ও এনজিওগুলো অনেক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। কিন্তু খামারির সংখ্যা অনুপাতে এটা নগণ্য। এ জন্য সহজ বাংলায় সচিত্র নির্দেশিকা তৈরি করতে হবে। আশা করছি সরকার ও সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত উদ্যোগে অদূর ভবিষ্যতে এ খাত স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে।















