
বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের উদ্যোগে জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত 'বিপর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থা: উত্তরণের পথ ওপন্থা' শীর্ষক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।মূল প্রবন্ধ তারা লিখিত বক্তব্যের মাধ্যমে পেশ করেন। শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড এ কথাটি সর্বজন স্বীকৃত হলেও বাংলাদেশের চরম দুর্ভাগ্য যে, গত ১৫-১৬ বছরে জাতির এই মেরুদন্ডের প্রায় পুরোটাই ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। ধর্মীয় ও দেশজ মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বহিশক্তির দেয়া প্রেসক্রিপশনে জাতীয় শিক্ষাক্রমকে ঢেলে সাজানো, পাবলিক পরীক্ষাগুলোতে প্রশ্নফাঁস ও নকলের অবাধ সুযোগ করে দেয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে পরীক্ষায় পাশের হার বেশি দেখানো, খাতায় লেখা থাকলেই নাম্বার দিতে হবে পরীক্ষকদের এমন নির্দেশনা প্রদানসহ শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য হেন কোন পদক্ষেপ নেই যা গ্রহণ করা হয়নি। ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তস্নাত আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সকল বিষয়ে নতুন করে ভাবার ও সংস্কার সাধনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও গুরুত্বপূর্ণ ৬ টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। এমতাবস্থায় নৈতিক বলে বলীয়ান উন্নত জাতি গঠনের লক্ষ্যে বিপর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ধর্মীয় ও দেশজ মূল্যবোধ, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্বকারী, নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রতকারী যুগোপযোগী উন্নত শিক্ষাব্যবস্থায় উত্তরণের পথ ও পন্থা খুঁজে বের করা সময়ের দাবী। সে লক্ষ্যেই আজকের এই মতবিনিময় সভা।যেভাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে১. দুর্নীতিপরায়ণ ও ধর্মবিরোধী চিন্তাচেতনার শিক্ষামন্ত্রী নিয়োগ: ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীনমহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর জাতিকে ধর্মহীন, মেধাশুন্য করার হীন মানসে পরপর এমন তিনজন ব্যক্তিকে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল যাদের ধর্মবিরোধী চিন্তাচেতনা বিভিন্ন সময়ে তাদের বক্তব্যে ও কাজে প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি দূর্নীতিকে উৎসাহিত করে এমন বক্তব্যও দিতে দেখা গেছে একজন শিক্ষামন্ত্রীকে।১৭ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে শিক্ষা ভবনে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শকদের উদ্দেশ্যে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, 'স্কুলে খাম তৈরি করা থাকে, আপনার কাজ হল আপনি গেলেন, গেলে আপনার খামটা আপনার হাতে ধরাই দিলে আপনি খাইয়্যা- দাইয়্যা তারপরে আসার সময় চলে আসবেন। আইস্যা রিপোর্ট দেবেন ঠিক আছে। সব জায়গায় যে বলেছি অপচয়-দুর্নীতি আমরা কঠোর অবস্থান নেব এবং দুর্নীতির ক্ষেত্রে আমাদের জিরো টলারেন্স। এটা আমাদের বলতে হবে কিন্তু আমি ইডির (ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্ট) সভায় বলছি, আপনারা দয়া করে ভালো কাজ করবেন। আপনাদের প্রতি আমার অনুরোধ, আপনারা ঘুষ খাবেন, তবে সহনশীল হইয়্যা খাবেন। অসহনীয় হয়ে বলা যায় আপনারা ঘুষ খাইয়েন না, এটা অবাস্তবিক কথা হবে।" একই অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, "খালি অফিসাররা চোর না মন্ত্রীরাও চোর, আমিও চোর"।নুরুল ইসলাম নাহিদ ছাত্রজীবনে ছিলেন বামপন্থী ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের নেতা। ১৯৯১ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। ১৯৯৪ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন।২০১৮ সালে ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে বিপর্যয়ের চুড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যান। পাঠ্যপুস্তকে শরীফ-শরীফার গল্পের মাধ্যমে সভ্যতাবিরোধী ট্রান্সজেন্ডার মতবাদের পরোক্ষ প্রচারণা, মানুষের উৎপত্তির ক্ষেত্রে কুরআন- সুন্নাহবিরোধী অপ্রমাণিত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব অন্তর্ভুক্তকরণ, সর্বোপরি ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষা সিলেবাসে ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং দেশীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিবিরোধী অসংখ্য বিষয় শিক্ষা সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তার আমলে। এসবের প্রতিবাদে আন্দোলনে নামা আলেম-উলামাদেরকে 'অপশক্তি' আখ্যা দেন তিনি। ১১ জুলাই ২০২২ তারিখে চাঁদপুরে এক সমাবেশে তিনি বলেন, "একটি অপশক্তি পাঠ্যবই নিয়ে গুজব ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছে”। যদিও পরবর্তীতে সরকার বেশ কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক সংশোধন করে আন্দোলনকারীদের বক্তব্যের যৌক্তিকতারই প্রমাণ দেয়।নীপু মনির বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও চাণ্ডর হয়েছে গণমাধ্যমগুলোতে। ২ কোটি টাকায় ভিসি, ৫০ লক্ষ টাকায় কলেজের অধ্যক্ষ নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া গাইড বই প্রকাশকদের থেকে ঘুষ নেয়া, চাঁদপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি দখল, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজের জন্য কমিশন নেয়ার অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া নওফেল সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সমূহের মানোন্নয়নের দিকে নজর না দিয়ে ছাত্র কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে অযৌক্তিক বিষেদগার করেন কওমি-নূরাণী মাদ্রাসার বিরুদ্ধে। ০৩ মার্চ ২০২৪ তারিখে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে জেলা প্রশাসকদের সম্মেলনে তিনি বলেন, 'সারা দেশে যত্রতত্র কওমি-নূরাণী মাদরাসা বাড়ছে। এতে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। এটি সবার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, যে কারণে এটি নিরসন করতে হবে। স্কুল চলাকালীন সময়ে এসব মাদ্রাসা বন্ধ রাখা যায় কিনা সে বিষয়েও ভবিষ্যতে আলোচনার কথা বলেন তিনি।শিক্ষা উপমন্ত্রী থাকাকালে তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেন, "ঈমান আমাদের অনেক শক্ত। সনাতন ভাই-বোনদের সাথে একই সাথে পুজা-অর্চনায় অংশ নিব, কেউ আমাদের আটকাতে পারবে না। যার ঈমান আছে তার ঈমান শক্তিশালী থাকবেই।" সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ মুসলিম এমন একটি দেশের শিক্ষা উপমন্ত্রীর ধর্মীয় জ্ঞানের এমন দৈন্যদশা কি কাকতালীয় হতে পারে। নাকি দেশের ৯০ ভাগ জনগণের ঈমান-আকীদা ধ্বংস করার জন্যই এমন লোকদের মন্ত্রীত্ব দেয়া হয় এমন প্রশ্ন উঠা অত্যন্ত যৌক্তিক।২. পাঠ্যপুঞ্জকে ধর্মীয় ও দেশজ মূল্যবোধবিরোধী বিষয়বস্তু সংযোজন: পাঠ্যপুস্তকে গত ১৫-১৬ বছবে দেশীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে মুছে ফেলে বিজাতীয় ধ্যানধারণা, সংস্কৃতিকে সুকৌশলে শিক্ষার্থীর মন- মানসে অনুপ্রবেশ করানোর অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। এছাড়া সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ, ধর্মীয় বিধিবিধানের বিধিবিধানের বিপরীত চিন্তাভাবনা, বিষয়বস্তু প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয়েছে শিক্ষা সিলেবাসে। ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত এনসিটিবি কর্তৃক প্রণীত পাঠ্যপুস্তকগুলোতে এর অসংখ্য নজীর রয়েছে।কিছু উদাহরণ।১. নবম শ্রেণীর শিল্প ও সংস্কৃতি বইয়ের ৫, ১১, ১৩ ও ৪১ তম পৃষ্ঠায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, নাচ, গান ইত্যাদির প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।২. নবন শ্রেণীর ডিজিটাল প্রযুক্তি বইয়ের ১১, ১৫, ৯৫, ১৩৬, ১৩৮, ১৪৫ পৃষ্ঠায় ছেলে-মেয়েদের একত্রে বসা, হাত মিলানো ইত্যাদিবিষয়কে স্বাভাবিকীকরণ করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে।৩. ৬৪ শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণী পর্যন্ত ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইগুলোতে কল্পিত 'অখণ্ড ভারত' ধারণাকে ভিত্তি করে প্রচুর প্রমাণহীনবিষয়বস্তু সংযোজন করা হয়েছে। মুসলমানদেরকে এ অঞ্চলে 'বহিরাগত আগ্রাসী' শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে। ৪. বয়সদ্ধি হয়েছে এমন ছেলেমেয়েদের ফ্রি মিক্সিং এর কোন সুযোগ নেই ইসলামে। অথচ নবম শ্রেণীর জীবন ও জীবিকা বই এর ৩৯, ৫১, ৫৭ পৃষ্ঠায় ছেলে মেয়েদের একদম পাশাপাশি রেখে ছবি দেয়া হয়েছে। এমনকি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের দোকান উদ্বোধন-এর ছবিটিতেও ছেলেমেয়েদের পাশাপাশি দেখানো হয়েছে যা অত্যন্ত আপত্তিকর।৫. আষ্টম শ্রেণীর বাংলা বইয়ের ২৮ নং পৃষ্ঠাটি একটু পড়ে দেখা যাক। সেখানে এক জায়গায় লেখা হয়েছে, "একটি তরুণী মেয়ে ওড়না গলায় ঝোলানো, নিচ থেকে টেনে তোলার জন্যে হাত বাড়িয়ে হাসিমুখ একটি তরুণকে ডাকছে।" আচ্ছা মেয়েটি কি ওই গ্রুপের অন্য কোন মেয়েকে পায়নি তাকে টেনে তোলার জন্য? এই বইয়েরই ১৭৭ পৃষ্ঠায় লাইব্রেরিতে অধ্যয়নরত হাফপ্যান্ট পরা একজন প্রাপ্তবয়স্ক যুবকের ছবি কোন দেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ করার অপপ্রয়াস চালানো হচ্ছে? বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে হাফপ্যান্ট পরে কোন যুবক পাবলিক লাইব্রেরীতে (যেখানে মেয়েদের উপস্থিতিও আছে) অধ্যয়ন কি খুব স্বাভাবিক বিষয়? প্রশ্ন রইল জাতির কাছে।এরকম আরও অসংখ্য নজীর পাঠ্যপুস্তক পর্যালোচনা করতে গিয়ে আমাদের চোখে ধরা পড়েছে। কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ায় সেগুলো এখানে আমরা উল্লেখ করছি না। এ বিষয়ে বিস্তারিত একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদনের বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের ওয়েবসাইটে শীঘ্রই উপলভ্য হবে ইনশাআল্লাহ।৩. প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নকলের অবাধ সুযোগ: বিগত বছরগুলোতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ও নকলের অবাধ সুযোগ মহামারী রুপ ধারণ করেছিল। খুব কম পাবলিক পরীক্ষা, চাকুরির পরীক্ষাই এমন ছিল যেগুলোর প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়নি। প্রশ্নপত্র ফাঁস সিন্ডিকেটের অনেক চাঞ্চল্যকর কাহিনী বিগত সরকার ক্ষমতায় থাকাবস্থায়ই প্রকাশ পেয়েছিল। এমনকি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনাও ঘটেছে। তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রীরা এগুলোকে গুজব বলে উড়িয়ে তো দেয়ার চেষ্টা করতই উপরন্ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের ভাষায় 'গুজব প্রচারকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার কথাই বেশি উচ্চারণ করত। অর্থাৎ অবস্থাটা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, প্রশ্নপত্র ফাঁস হোক সমস্যা নেই কিন্তু কেউ প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে বললে তাকে গুজবপ্রচারকারী সাব্যস্ত করে হেনস্থা করা হত। এভাবেই প্রশ্নপত্র ফাঁসকারী সিন্ডিকেট পার পেয়ে যেত। আর জাতির ভাগ্যে জুটত মেধাহীন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা ইত্যাদি। নকলের সুযোগ না দিলে কিংবা নকলে বাধা দিলে শিক্ষকদের নাজেহাল করার অনেক ঘটনার নজীরও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে বিগত বছরগুলোতে।৪. উত্তরপত্রের শিথিল মূল্যায়ন ও ফরমায়েশি পাসের হার বৃদ্ধি।বিগত বছরগুলোতে জিপিএ ৫ ও পাশের হাবের বাম্পার ফলন হয়েছে। উত্তরপত্রের শিথিল মূল্যায়নের গোপন নির্দেশনা ও ফরমায়েশি পাসের হার বৃদ্ধি দেখানোর পলিসির কারণেই এটা হয়েছে বলে মনে করি আমরা। দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হওয়ার পর অনুসন্ধানী সাংবাদিকগণ সঠিকভাবে অনুসন্ধান চালালে এ বিষয়ের সত্যতা অবশ্যই বেরিয়ে আসবে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে চতুর্থ বিষয় ব্যতিরেকেই জিপিএ ফাইভ (যা গোল্ডেন জিপিএ ফাইভ নামে পরিচিত) পাওয়া শিক্ষার্থীদের সিংহভাগ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় আসা তো দূরের কথা পাস নম্বর অর্জন করতেও ব্যর্থ হচ্ছে। 'আই অ্যাম জিপিএ ফাইভ' প্রকল্পের এই দায়ভার সম্পূর্ণরুপে বর্তাবে শিক্ষাব্যবস্থাকে বিপর্যন্ত করার কারিগরদের উপর।৫. জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে অপ্রতুল বরাদ্দ:ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুসারে, একটি দেশের একটি দেশের মোট জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করা উচিত। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরে শিক্ষাখাতে মোট বরাদ্দ ছিল জিডিপির ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এর আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এই খাতে বরাদ্দ ছিল জিডিপির এক দশমিক ৮৩ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল দুই দশমিক ০৮ শতাংশ। অর্থাৎ, জিডিপি অনুপাতে শিক্ষাখাতে বরাদ্দ প্রতি বছর নিয়মিতব্যবধানে কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষাখাতে ১,১১,১৫৭ (এক লাখ এগার হাজার একশ সাতান্ন) কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অপরদিকে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে নেয়া ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ১,১৩,৫০০ (এক লাখ তের হাজার পাঁচশত) কোটি টাকা। শিক্ষাকে সরকার কতটুকু গুরুত্ব দিত তা এই বাজেটের এই চিত্র থেকে ফুটে উঠেছে। ভৈৗত অবকাঠামো উন্নয়নের নামে দেশী-বিদেশী উৎস থেকে বিপুল পরিমাণের ঋণের বোঝা জনগণের উপর পড়েছে। আর এসবের নামে লুটপাট, টাকা পাচার করেছে তৎকালীন সরকারী দল। সারাদেশের বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামো ও পাঠদানের মানোন্নয়নের দিকে নজর না দিয়ে দেশের এক বিরাটজনগোষ্ঠীকে মানসম্পন্ন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম অনুষঙ্গ গবেষণা খাতকেও বরাবরের মতো অবহেলা-উপেক্ষার পাত্র বানানো হয়েছে।উত্তরণের লক্ষ্যে আমাদের প্রস্তাবনাটেকসই জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষাব্যবস্থার এই বিপর্যয় থেকে বেরিয়ে আসার বিকল্প নেই। জুলাই ও আগস্ট বিপ্লবের পর প্রায় সব ঘরানার সচেতন মহল শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়নে সভা-সেমিনার করেছেন, মুল্যবান মতামত ও প্রস্তাবনা পেশ করেছেন এবং সামনেও করবেন বলে আমরা আশা করছি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সবার মতামত ও প্রস্তুাবনাকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের একটি রুপরেখা প্রদান করবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। এ লক্ষ্যে আমরাও আমাদের মতামত ও প্রস্তাবনা তুলে ধরছি।১. শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণ থেকে বের হয়ে আসা।পাশ্চাত্য সভ্যতা আমাদেরকে জান-বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে উন্নতির চরম শিখরের নমূনা দেখালেও মানুষের মত মানুষ হওয়ার শিক্ষা একমাত্র ধর্মীয় শিক্ষ্য তথা ইসলামী শিক্ষার মধ্যেই পাওয়া যায় আমাদের একীভুত পরিবার ব্যবস্থা, সামাজিক বন্ধনের বিপরীতে পশ্চিমাদের সিঙ্গেল মাদার, সিঙ্গেল ফাদার পরিস্থিতি, বৃদ্ধাশ্রম, একাকী মৃত্যবরণসহ সামাজিক নানামূখী রুঢ় বাস্তবতাকে আমরা আমন্ত্রণ জানাতে পারিনা। অতএব, সর্বকিছুতে অভ আনুগত্য না করে পশ্চিমা সভ্যতার ভাল দিকগুলো গ্রহণ করা ও মন্দ দিকগুলো পরিহার করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত শিক্ষা ও জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবাইকে অবশ্যই নিতে হবে। এদেশের মানুষের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ধর্মবিশ্বাসের উপযোগী করেই শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি সাজাতে হবে।২. শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সবল কমিটিতে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্তকরণ এবং বিতর্কিত ব্যক্তিদের ছাঁটাইকরণ:শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় সংস্কার সাধন করতে হবে। এ লক্ষে গঠিত ও গঠিতব্য সকল কমিটিতে যোগ্য ও গ্রহণযোগ্য ব্যাক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বিজাতীয় সংস্কৃতির প্রতি মোহাচ্ছন্ন, নাস্তিক্যবাদ ও ধর্মহীনতায় বিশ্বাসী ও বিতর্কিত ব্যক্তিদেরকে এসব কমিটি থেকে বাদ দিতে হবে। ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূদ্ধি সংস্কারে যোগ্য আলেম প্রতিনিধি সংস্কার কমিটিগুলোতে রাখতে হবে।৩. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রুপদান:বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উচ্চশিক্ষিত বেকার তৈরির প্রতিষ্ঠান বানানোর পরিবর্তে বিশ্বমানের গবেষণা প্রতিষ্ঠানে রুপদান করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ গবেষণার মাধ্যমে জ্ঞানের নিত্যনতুন দিক উন্মোচন করা। রাজনৈতিক তল্পিবাহক বা দলবাজ শিক্ষক তৈরি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় নয়। মেধা পাচার যাতে না হয় সে ধরনের ভৌত অবকাঠামো ও শিক্ষা-গবেষণার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।৪. ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে কওমী সনদপ্রাপ্তদের নিয়োগদান:৩য় শ্রেণী থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত ইসলাম শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকলেও যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার্থী ইসলাম শিক্ষার প্রতি তেমন একটা গুরুত্ব প্রদান করে না। অনেক সময় ইসলামের মর্মবাণীর বিপরীত চিন্তাধারার শিক্ষকরাও পাঠদান করেন। ফলে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হওয়ার পরিবর্তে ধর্মীয়ভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়। আমাদের প্রস্তাবনা হল, ১ম শ্রেণী থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত ইসলাম শিক্ষা বাধ্যতামূলকভাবে পাঠ্যক্রমে রাখতে হবে এবং পাঠদানের জন্য সরকারিভাবে স্বীকৃত কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীস উত্তীর্ণদের ধর্মীয় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগদানেরবিধিমালা প্রণয়ন করতে হবে। বার্ষিক পরীক্ষা, পাবলিক পরীক্ষায় ইসলাম শিক্ষা বাদ দেয়ার নতুন কোন নজীর স্থাপন করা যাবে না।৫. কওমী সনদপ্রাপ্তদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করা:দাওরায়ে হাদীস উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, সততা, মূল্যবোধ এবং দেশ ও জাতির প্রতি নিবেদন প্রশ্নাতীত। তাদের জন্য উপযুক্ত বিষয় ওক্ষেত্রগুলোতে দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পথ সুগম করা হলে তারাও আনুষ্ঠানিকভাবে জাতির খেদমত করা ও জাতীয় উন্নতিতেঅবদান রাখতে পারবে এবং তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে ইনশাআল্লাহ।৬ . আলিয়া মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবজেক্ট চয়েজে বৈষম্য দূরীকরণ:বিগত বছরগুলোতে আলিয়া মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষাষীরা বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাতালিকায় চান্স পেলেও কোন এক অদৃশ্য ইশারায় তাদের চয়েস লিস্টে থাকা ভাল ভাল সাবজেক্টগুলোতে চান্স পেত না। এই বৈষম্য চলতি সেশন থেকেই পুরোপুরি দূর করতে হবে।৭. জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি:জাতীয় বাজেটে শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে। এক্ষেত্রে ইউনেস্কো প্রস্তাবিত মানদণ্ড অনুসরণ করতে না পারলেও কাছাকাছিযাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। উচ্চাভিলাসী ও লোকদেখানো অবকাঠামো উন্নয়নের স্থলে শিক্ষা ও গবেষণাখাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে ব্যয় হচ্ছে সেটাও কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। বন্যা, গুলাবদ্ধতা, ট্র্যাফিক জ্যামসহ বড় বড় দুর্যোগমোকাবেলা ও নাগরিক সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাসংশ্লিষ্টদের সাথে সরকারের নীতিনির্ধারক মহলের ঘনিষ্ট যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। সকল বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামতকে প্রাধান্য দেয়ার সংস্কৃতি চালু করতে হবে। ইন্ড্রাস্টির সাথে একাডেমিশিয়ানদের কার্যকর যোগসূত্র তৈরি করতে হবে।৮. স্কুল-কলেজে বিজ্ঞান ও অন্যান্য বিষয়ের ব্যবহারিক ক্লাসের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে। ডিভাইসমূখী করার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদেরকেবইমুখী ও বাস্তব বিষয়াদি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও অনুসন্ধিৎসু মানসিকতা অর্জনে উৎসাহ দিতে হবে।৯. প্রজনন ও স্বাস্থ্য শিক্ষার নামে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিব্রতকর বিষয়বস্তু শিশু ও টিনেজ বয়সী শিক্ষার্থীদের সিলেবাস থেকে বাদ দিতেহবে। এসব বিষয় মানুষ পারিবারিকভাবে এবং প্রাকৃতিকভাবেই শিখে উঠে। আলাদাভাবে এটা শিক্ষা কারিকুলামে অন্তর্ভুক্তকরণের কোনপ্রয়োজন আছে বলে আমরা মনে করি না।১০. ছেলে-মেয়েদের উন্নত চরিত্র গঠন ও নৈতিকতা বিকাশের স্বাথ্যে সহশিক্ষা বন্ধ করতে হবে। ছেলে মেয়েদের পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবাক্লাসের ব্যবস্থা করতে হবে। হিজাব-নিকাব ও দাঁড়ি-টুপি পরিধানকারী শিক্ষার্থীদের নানাভাবে হয়রানি করা বন্ধ করতে হবে।১১. বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় আইনের মাধ্যমে সরকারের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার পথ বের না করে এই আইনকে আরও উদ্যোক্তাবান্ধব করতে হবে। ১২. অটোপাশের ধারা চিরতরে বন্ধ করতে হবে।১৩. উচ্চতর পড়াশোনায় প্রত্যেক প্রোগ্রামে বিদ্যমান পাঠ্যসূচিতে প্রাসঙ্গিক ধর্মীয় কোর্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যেমন, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ইসলামের রাষ্ট্রনীতি, আইনের ক্ষেত্রে ইসলামের ফৌজদারি ও দেওয়ানি আইনসমূহ, অর্থনীতির ক্ষেতে ইসলামী অর্থনীতি, পৌরনীতির ক্ষেত্রে ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা খলীফা ও শাসকদের গৃহীত নগর ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ১৪ . পাঠ্যপুস্তকের সকল সংস্করণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা এনসিটিবির ওয়েবসাইটে উপলভ্য রাখতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত প্রণীতসকল পাঠ্যবইয়ের সকল সংস্করণ এনসিটিবির ওয়েবসাইটে রাখতে হবে যাতে শিক্ষাব্যবস্থার ক্রমপরিবর্তন নিয়ে সহজেই গবেষণা করা ও মতামত প্রদান করা যায়। ভবিষ্যতে কোন সংযোজন বিয়োজন হলে সেগুলোও নতুন সংস্করণ হিসেবে ওয়েবসাইটে আপডেট রাখতে হবে। ১৫. শিক্ষাব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের সকল বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, জবাবাদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। শব্দের মারপ্যাঁচে জনগণকে ধোঁকা দেয়া চলবে না।
প্রধান সম্পাদক : ফারুক হোসেন | ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোঃ মতিউর রহমান
নির্বাহী সম্পাদক : হাজী মোঃ লিয়াকত আলী,যুগ্ম-সম্পাদক: আব্দুল মালেক,যুগ্ম - সম্পাদক মোঃ আলমগীর হোসেন , ব্যুরো প্রধান: ফাহারিয়া ইসলাম( মুন) প্রেস এডিটর: মোঃ ফয়সাল হোসেন , মোঃ শান্ত।
যোগাযোগ ০১৭৬৫৮৮৪৪৪৯
দেশপ্রিয়২৪.কম