হাম কি সত্যি-ই ভয়ানক

- নিউজ প্রকাশের সময় : ১১:৩২:৫৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬ ১ বার পড়া হয়েছে

প্রতিবেদন
হাম (Measles) একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে। এটি শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমে ছড়ায় এবং দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সংক্রমিত হয়। যথাসময়ে টিকা না নিলে এই রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।
দেশে আবারও বাড়তে শুরু করেছে হাম (Measles) রোগের সংক্রমণ, যা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় হাম রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

*হাম রোগের ইতিহাস*
হাম রোগ বহু প্রাচীনকাল থেকেই মানবজাতির মধ্যে বিদ্যমান। ধারণা করা হয়, ৯ম শতাব্দীতে প্রথম এই রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। ২০শ শতাব্দীতে টিকা আবিষ্কারের আগে বিশ্বব্যাপী লক্ষ লক্ষ মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতো এবং মৃত্যুর হারও ছিল অনেক বেশি।
১৯৬৩ সালে হাম প্রতিরোধের টিকা আবিষ্কারের পর বিশ্বব্যাপী সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে। বাংলাদেশেও Expanded Programme on Immunization (EPI) চালুর মাধ্যমে হাম নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়।বাংলাদেশে অতীতে হাম একটি সাধারণ ও প্রাণঘাতী রোগ ছিল। তবে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির ফলে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে আসে।
বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে। যেসব শিশু নিয়মিত টিকা পায়নি বা টিকার ডোজ সম্পূর্ণ করেনি, তাদের মধ্যেই হাম আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। হাসপাতালগুলোতে জ্বর, ফুসকুড়ি, কাশি ও চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে অনেক শিশুকে ভর্তি হতে দেখা যাচ্ছে

*বর্তমান পরিস্থিতি (বাংলাদেশ)*
সম্প্রতি দেশে আবার হাম রোগের সংক্রমণ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে এর প্রধান কারণ:
• করোনা পরবর্তী সময়ে টিকাদান ব্যাহত হওয়া
• অনেক শিশুর টিকার ডোজ অসম্পূর্ণ থাকা
• অভিভাবকদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতি
বর্তমানে হাসপাতালগুলোতে জ্বর, ফুসকুড়ি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে।

*হাম রোগের ঝুঁকি*
হাম রোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এর দ্রুত সংক্রমণ ক্ষমতা। একজন আক্রান্ত ব্যক্তি হাঁচি-কাশি দিলে বাতাসের মাধ্যমে খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
এই রোগের কারণে শরীরে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিতে পারে, যেমন—
• নিউমোনিয়া (ফুসফুসে সংক্রমণ), যা শিশুদের মৃত্যুর প্রধান কারণগুলোর একটি
• ডায়রিয়া ও পানিশূন্যতা
• কানের সংক্রমণ, যা শ্রবণশক্তি কমিয়ে দিতে পারে
• মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস), যা স্থায়ী শারীরিক বা মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে
দুর্বল পুষ্টি বা কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন শিশুদের ক্ষেত্রে হাম আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। ভিটামিন ‘এ’ এর ঘাটতি থাকলে জটিলতা বাড়ার ঝুঁকি থাকে

*হাম থেকে রক্ষার সতর্কতা*
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা (MMR vaccine)। সময়মতো টিকা দিলে এই রোগ প্রায় শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। পাশাপাশি আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে, সরকার ইতোমধ্যে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা দেওয়ার পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করার কাজও করছেন।
হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও সচেতনতার অভাব ও টিকা গ্রহণে অবহেলার কারণে এটি আবারও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হয়ে উঠছে। তাই প্রতিটি অভিভাবকের উচিত তাদের সন্তানদের নির্ধারিত সময় অনুযায়ী টিকা প্রদান নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।
মো. সারোয়ার জাহান সাদী
বিএসসি, বায়োকেমিস্ট্রি এন্ড মলিকুলার বায়োলজি













