মুন্সীগঞ্জের ইত্যাদির পর্ব যেন সামাজিক বার্তায় হৃদয়ছোঁয়া কিছু বিষয়ে ফুটে উঠেছে।

- নিউজ প্রকাশের সময় : ১১:৫৯:৪৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ অগাস্ট ২০২৩ ১২১ বার পড়া হয়েছে

শুক্রবারে বাংলাদেশ টেলিভিশন(BTV) প্রচার জটিলতা
শেষে ইত্যাদির প্রচার হলো গত শনিবার। এত বছরে ইত্যাদির প্রচারের ক্ষেত্রে এ ধরনের জটিলতা হতে দেখা যায়নি। লক্ষ লক্ষ দর্শক অনুষ্ঠানটি দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন। প্রতিনিয়ত যেন ইত্যাদি একটি নতুন রূপ নিয়ে আসে। বিষয়, স্থান, নির্মাণ বৈচিত্র্যের কারণে একটির সঙ্গে অন্যটির কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। এর প্রধান কারণ বরেণ্য নির্মাতা হানিফ সংকেতের সুচিন্তিত পরিকল্পনা। দর্শককে কীভাবে টিভি’র সামনে বসিয়ে রাখতে হয় কিংবা অনলাইন মাধ্যমেও কীভাবে ট্রেন্ডিংয়ে থাকতে হয় সেই মন্ত্র এই মিডিয়া জাদুকরের জানা।
টেলিভিশনের মূলমন্ত্র তথ্য, শিক্ষা ও বিনোদনের পুরোটাই ছিল এবারের ইত্যাদিতে। প্রতিটি প্রতিবেদনই তথ্যবহুল ও শিক্ষণীয়। মুন্সীগঞ্জের উপর করা প্রতিবেদনটিকে বলা যায় এক নজরে মুন্সীগঞ্জ।প্রতিবেদনের পরিচিত পরিবেশনা থেকে বেরিয়ে হানিফ সংকেত কখনো কখনো নিজেই সম্পৃক্ত হয়েছেন পর্দায়।
এর ফলে প্রতিবেদনটি আরও বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।যেমন অতীশ দীপংকরের স্তূপ এবং চতুর্সত্য স্তম্ভের পরিচিতি, স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর পৈতৃক বাড়ি সবকিছু মিলিয়ে জেলার প্রতিবেদনটি ছিল শৈল্পিক।প্রকৃতির মাঝে শতাধিক নৃত্যশিল্পীর মুন্সীগঞ্জ নিয়ে পরিবেশিত নাচটি দেখে মনে হয়েছে যেন কাশবনে কিছু হলুদ ফুল।
মিডিয়ায় কাজ করতে আগ্রহী এক যুবকের দেশের কোনো জেলার ভাষাকে বিকৃতি করার প্রতিবাদে নির্মাতার সঙ্গে কাজ না করে নিজেই সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা করার অঙ্গীকার করা। একজন সংগীতশিল্পীর ভিউ ব্যবসার শিল্পী না হয়ে অশ্লীলতা ও অসভ্যতা পরিহার করে সত্যিকার সংগীতশিল্পী হওয়ার অঙ্গীকার। অফিসে বসের শপথ ‘অফিসে আসিয়া আমি মনে মনে বলি, আমি যেন অফিসেতে ভালো হয়ে চলি’-বলে ভালো থাকার অঙ্গীকার, বাবুর্চির রন্ধনশালায় এসে নিরাপদ খাদ্যের অনুসন্ধান। অনলাইনে সব হলেও মায়া-মমতা, স্নেহ-ভালোবাসা না হওয়া সংক্রান্ত বার্তা। ভাগ্যে থাকলেই সবসময় সবকিছু হয় না, তার জন্য পরিশ্রম করা ও সৎ হবার বার্তা। কৃষকের কণ্ঠে উচ্চারণ ‘সবাই চাকরি করে কিন্তু কৃষকরা চাকরি করে না।
আপনাদের চাকরির মেয়াদ আছে কিন্তু কৃষকের কোনো মেয়াদ নাই। যতোদিন দেহে প্রাণ আছে আর শরীরে শক্তি আছে-ততদিন ক্ষেতে ধান ফলাই মানুষেরে খাওন যোগাই’ এমন সমাজ সচেতনতামূলক বার্তায় পরিপূর্ণ ছিল এবারের ইত্যাদি।২০ বছর আগে ইত্যাদির দেয়া গাছের চারা এখন কতো বড় হয়েছে জানা গেল মুন্সীগঞ্জ ও সাভারের দর্শকের কাছে।বোঝা গেল ইত্যাদির দেয়া উপহারের সদ্ব্যবহার করেন দর্শকরা। মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী টিনের ঘর এবং অবাক করা ঘরের হাটের উপর প্রতিবেদন এবং একটি তিনতলা বাড়ির মালিকের সাক্ষাৎকারটি ছিল ব্যতিক্রমী।
টিনের ঘর ও ভূ-প্রকৃতির উপর নির্ভর করা বিভিন্ন জেলার ঘর সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া গেল এই প্রতিবেদনটিতে। তিনজন সৈকত শিশুর গান শুনে মনেই হয়নি ওরা টিভি পর্দায় এই প্রথম গাইলো। তাও আবার ইত্যাদির মতো অনুষ্ঠানে। দর্শকপর্বে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আশির দশকের জনপ্রিয় শিল্পী ফেরদৌস ওয়াহিদ ও এই প্রজন্মের বালাম। ইত্যাদির মাধ্যমে জানা যায় এই দুই শিল্পীর বাড়ি মুন্সীগঞ্জে।আশির দশকের ফেরদৌস ওয়াহিদের সমসাময়িক ফিরোজ সাঁই, ফকির আলমগীর, আজম খান ও পিলু মমতাজের ৪টি জনপ্রিয় গান নিয়ে বিজয়ী নির্বাচন করা হয় এই পর্বে। সবশেষে বালাম আর ফেরদৌস ওয়াহিদের কণ্ঠে জনপ্রিয় গান ‘এমন একটা মা দে না’ দু’জনেই গাইলেন সমস্বরে। জাদু শিল্পী ফারহানুল ইসলামের অবিশ্বাস্য মনস্তাত্ত্বিক জাদু দর্শকদের আনন্দ দিয়েছে।এবারে মূল গানটি গাইলেন জনপ্রিয় অভিনেতা ও কণ্ঠশিল্পী তাহসান খান। ইত্যাদির মাধ্যমে জানলাম তার বাড়িও মুন্সীগঞ্জে। তাহসান মঞ্চে আসতেই দর্শকরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানায়। ভালো লেগেছে নানি-নাতির পর্ব এবং লেক মিশিগানের অবাক করা তথ্যবহুল প্রতিবেদন। নাচ-গান, আনন্দের পর ইত্যাদির চরিত্রানুযায়ী ছিল বরগুনা জেলার তালতলী উপজেলার নিওপাড়ার ৪ বোন রহিমা, হালিমা, ফাতেমা ও জরিনার জীবন চিত্র। পানি, মাছ, নৌকা ও বড়শি নিয়েই যাদের জীবন। এই অসহায় চার বোনের জীবন সংগ্রাম দেখে অনেকের চোখে পানি এসেছে। অনুষ্ঠানে তাদের দুই লাখ টাকা দেয়া হয়। আমাদের সমাজে এমন অনেকে আছেন যাদের জন্য সমাজকেই এগিয়ে আসতে হবে। দিতে হবে সামাজিক নিরাপত্তা। দীর্ঘ ৩৫ বছরের শেষে এসে নির্মিত এবারের পর্বটি দেখে মনে হয়েছে ইত্যাদি এখনো চির নবীন, সেই চিরচেনা চেহারায় রয়েছে দর্শক হৃদয়ের মণি কোঠায়।
















