ঢাকারবিবার , ২১ এপ্রিল ২০২৪
  • অন্যান্য
আজকের সর্বশেষ খবর

গাজীপুরে প্রভাবশালী  দখলদারদের পেটে গাজীপুরের বনাঞ্চল পুরোটাই

স্টাফ রিপোর্টার মেহেদুল ইসলাম
এপ্রিল ২১, ২০২৪ ৮:১৪ অপরাহ্ণ । ২২ জন
Link Copied!

print news

গাজীপুর সদর উপজেলার মণিপুর এলাকায় সিরামিকস পণ্যের বিশাল এক কারখানা গড়েছেন কোরিয়ার নাগরিক সেন চিংহু। সান পাওয়ার সিরামিকস লিমিটেড নামের এই কারখানার পুরোটাই গড়ে উঠেছে সংরক্ষিত বনভূমিতে।শুধু এই কারখানা নয়, রাজধানীর পাশে গাজীপুরে এভাবেই দেশি-বিদেশি শিল্পকারখানা, রিসোর্ট, পিকনিক স্পটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ১২ হাজার একরের বেশি বনভূমি জবরদখল করা হয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। অথচ এই আগ্রাসন ঠেকাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই বন বিভাগের।খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সান পাওয়ার সিরামিকস কারখানাটি বোকরান মণিপুর মৌজায় সিএস ৪২৮ নম্বর দাগে শূন্য দশমিক ৫৮ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখল করেছে। এ ছাড়া সিএস ৫৯৮ নম্বর দাগে ৫ দশমিক ৫৭ একর অন্য বনভূমি দখল করে বানানো হয়েছে ভবন ও সীমানাপ্রাচীর। এসব বনভূমি উদ্ধার করতে ২০০৭, ২০০৯ ও ২০১৩ সালে পিওআর মামলা ও উচ্ছেদ মোকদ্দমার প্রস্তাব পাঠানো হয়। কিন্তু এসবেরও কোনো হালনাগাদ তথ্য মেলেনি।বনভূমি দখলের কথা স্বীকারও করেছেন ওই কারখানার ভূমি ব্যবস্থাপক সেলিম ভূঞা। আজকের পত্রিকাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের দখলে ৫০ শতক বনভূমি রয়েছে। এক-এগারোর সময় উচ্ছেদ করতে এলে আমরা বিদেশি বিনিয়োগের কারখানা হিসেবে বিনিয়োগ বোর্ডের কাছে আবেদন করেছিলাম, যেন যতটুকু বনভূমি দখলে আছে, সে পরিমাণ জমি অন্যত্র কিনে আমরা বনায়ন করে দিতে পারি। কিন্তু এখনো সেই আবেদনের সুরাহা হয়নি।’একসময়ে শালবনের জন্য বিখ্যাত ছিল ভাওয়াল অঞ্চল। গাজীপুর সদর, শ্রীপুর ও কালিয়াকৈর উপজেলায় বিস্তৃত এই বনাঞ্চলের আয়তন প্রায় ৫২ হাজার একর। এই বনভূমি দেখভাল করার দায়িত্ব ঢাকা বন বিভাগ এবং ঢাকা বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের। কিন্তু তাদের অবহেলায় ক্রান্তীয় পাতাঝরা বৃক্ষের এই বনাঞ্চল উজাড় হওয়ার পথে।বন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গাজীপুরে সংরক্ষিত ও অন্যান্য বনভূমি মিলিয়ে ১২ হাজার একর বনভূমি জবরদখল করা হয়েছে। দেশি-বিদেশি ৭৭টি শিল্পকারখানাসহ ১৪ হাজার ৫৫৫ জনের দখলে আছে ৬ হাজার ৮৬ দশমিক ৮৪ একর সংরক্ষিত বনভূমি। ৯৭টি শিল্পকারখানাসহ ১১ হাজার ১৩১ জনের দখলে ৫ হাজার ৮১২ একরের বেশি সাধারণ বনভূমি।পরিবেশবাদীদের দাবি, গাজীপুরে বেদখল হওয়া বনভূমির পরিমাণ বাস্তবে কয়েক গুণ বেশি। তাঁরা বলছেন, বেহাত বনভূমি উদ্ধার বা নতুন দখল ঠেকাতে বন বিভাগের কোনো ভূমিকা দৃশ্যমান নয়। মাঝেমধ্যে লোকদেখানো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয় এবং জেলা প্রশাসককে চিঠি দেওয়া হয়।বন বিভাগের উদাসীনতায় জেলা প্রশাসনও অসন্তুষ্ট। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আবুল ফাতে মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘গাজীপুরের হাজার হাজার একর বনভূমি জবরদখল হয়েছে। এসব উদ্ধারের জন্য বন বিভাগ কখনো আমার কাছে আসেনি। আমার এখানে কবে, কতটি উচ্ছেদ মোকদ্দমার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে বা উচ্ছেদসংক্রান্ত কোনো কাজ আটকে আছে কি না, সে বিষয়ে আমাকে কিছু জানানো হয়নি। এ নিয়ে তারা কেউ আমার সাথে সমন্বয় করেনি। তারা বিভিন্ন সময় আমার কাছে আসে সীমানা নির্ধারণ বা বনের ভেতর দিয়ে রাস্তা দেওয়ার বিষয় নিয়ে। এসব বিষয়ে তাদের আগ্রহ বেশি।’ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাজ্জাদুল হোসেন অবশ্য দাবি করেন, জেলা প্রশাসনের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ আছে। তিনি বলেন, ‘উচ্ছেদ মোকদ্দমাসহ বিভিন্ন বিষয়ে জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ হচ্ছে। আশা করছি, শিগগির ভালো উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ভাওয়াল গড় বাঁচাও আন্দোলনের মহাসচিব রিপন আনসারী বলেন, বন রক্ষায় বন বিভাগ কখনোই আন্তরিক ছিল না। তারা লোকদেখানো গাছ লাগায়, নিরীহ লোকজনের নামে বন মামলা দেয়। বড় প্রতিষ্ঠান বনভূমি দখল করলে তারা নীরব থাকে। অনেক সময় মামলা করলেও তদবির করে না।এর সত্যতা মেলে পারটেক্স গ্রুপের আম্বার ডেনিম লিমিটেডের সহকারী ব্যবস্থাপক (আইন) অ্যাডভোকেট মো. শামীমের কথায়ও। তিনি বলেন, যেসব মামলার কথা বলা হয়েছে, সেগুলোর দুটি এরই মধ্যে বন বিভাগ তদবির না করায় খারিজ হয়ে গেছে।সম্প্রতি ঢাকা বন বিভাগের অধীন গাজীপুর সদর উপজেলার মণিপুর বিট এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান রেঞ্জের বাহাদুরপুর মৌজায় সিএস ২৫৪, ২৮৯, ২৯৪, ৩০০ নম্বর দাগে প্রায় ১১ দশমিক ৬৭ একর সংরক্ষিত বনভূমি দখলে রেখেছে পারটেক্স কটন লিমিটেড। একই মৌজার সিএস ২০৮/৫৮৫, ২০৮/৫৮৬ নম্বর দাগে পারটেক্স হোল্ডিংস লিমিটেড ৫ দশমিক শূন্য ৯ একর সংরক্ষিত নয় এমন বনভূমি দখল করেছে। এ ছাড়া পারটেক্স গ্রুপের আম্বার ডেনিম লিমিটেড বাউপাড়া বিটের আড়াইশ প্রসাদ মৌজায় আরএস ৮ থেকে ১৮ এবং ২৮ থেকে ৩২ নম্বর দাগে ২৬ দশমিক ২৪ একর বনভূমি ১৫-২০ বছর ধরে দখল করে রেখেছে।এসব বনভূমি উদ্ধার করতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে কয়েকটি মামলা (দে. মো. ৩৯/২০০৩, ৬১/২০০৪, ১০৩/২০০৫ ও ৪০২/২০১৫) করা হয়। বাহাদুরপুর মৌজার জমি উদ্ধারের জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে উচ্ছেদ মোকদ্দমার প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এসব মামলার বর্তমান অবস্থা কেউ জানে না।আম্বার ডেনিমের মো. শামীম আরও বলেন, ‘কারখানার ১২০ একর জমির মধ্যে ৩৬ একর ২০১২ সালে বনের নামে গেজেট হয়েছে। যেসব মামলার কথা বলা হয়েছে, তার দুটিতে হাইকোর্টের আদেশ নিয়ে কাজ চালাচ্ছি।’একই এলাকার বোকরান মণিপুর মৌজায় সিএস ৫৯৮ নম্বর দাগে ফু ওয়াং গ্রুপ লিমিটেড (সিরামিক ও ফুড) ৪ দশমিক ৪০ একর সংরক্ষিত এবং ৫ দশমিক ৬৫ একর অন্য বনভূমি দখল করেছে। বন বিভাগের দাবি, এ নিয়ে ২০০৪ সালে জয়দেবপুর থানায় মামলা করা হয়। ২০০৭ সালে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ মোকদ্দমাসহ চারটি মামলা করা হয়েছে। কিন্তু মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থার কোনো তথ্য মেলেনি বন বিভাগ থেকে।তবে ফু ওয়াং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের দখলে বনের কোনো জমি নেই।’কোকোলা ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড কালিয়াকৈর উপজেলার মৌচাক বিটের কৌচাকুড়ি মৌজায় সিএস ৯৪২ নম্বর দাগে ১৫ দশমিক শূন্য ৫ একর বনভূমিতে ঘরবাড়ি বানিয়ে দখল করে রেখেছে। এসব বনভূমি উদ্ধার করতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে ২০১৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কাছে উচ্ছেদ মোকদ্দমার প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং পরে থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়। কিন্তু এসব কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য বন বিভাগের কাছে নেই। অবশ্য এ বিষয়ে কোকোলা ফুড প্রোডাক্টসের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।ঢাকা বন বিভাগ এবং বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের গভ. ফরেস্ট রিটেইনার অ্যাডভোকেট রেজাউল করিম বলেন, ‘এসব মামলা অনেক আগের। নথিপত্র না দেখে কিছুই বলা যাবে না।’বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা শারমীন আক্তার বলেন, ‘আমাদের যেসব সংরক্ষিত বনভূমি জবরদখল করা হয়েছে, সেগুলো উদ্ধারের জন্য জেলা প্রশাসকের নিকট উচ্ছেদ মোকদ্দমার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আমরাও খুব উদ্‌গ্রীব।’ ২০১৩ সালে প্রস্তাব দেওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসকের সাথে যোগাযোগ রাখছি।’ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা সাজ্জাদুল হোসেন বলেন, ‘গাজীপুরে আমাদের বেদখল হওয়া বনভূমি ১২ হাজার একরের কম হবে। আমরা কয়েক শ একর বনভূমি উদ্ধার করেছি।’বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) গাজীপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হাসান ইউসুফ খান বলেন, গাজীপুরের ঐতিহ্যবাহী শালবন কেটে গড়ে তোলা হচ্ছে শিল্পকারখানাসহ নানা স্থাপনা। কেউ কেউ সীমানাপ্রাচীর দিয়ে দখল করে রেখেছে বনের জমি। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা, দুর্নীতি ও অদক্ষতা বন ধ্বংসের মূল কারন।