ঢাকাশুক্রবার , ২২ মার্চ ২০২৪
  • অন্যান্য
আজকের সর্বশেষ খবর

হঠাৎ ঢাকায় ভিক্ষুকের ঢল

রিপোর্টার ফয়সাল হোসেন 
মার্চ ২২, ২০২৪ ৫:০২ পূর্বাহ্ণ । ৪৯ জন
Link Copied!

print news

ভিক্ষুকের ঢল নেমেছে রাজধানীতে। অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারকার ঢলে রয়েছে মাত্রাগত পার্থক্য। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, বিকলাঙ্গ, প্রতিবন্ধীদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রান্তিক নি¤œবিত্ত, নি¤œ আয়ের কর্মচারী, অসুস্থ শ্রমিক, শিশু ও বিধবারা। নগরীতে বিদ্যমান ভিক্ষুকের সঙ্গে নিত্য যুক্ত হচ্ছে ভিক্ষুকের নতুন কাফেলা। প্রতিবন্ধী, বয়োবৃদ্ধ, বিধবা, খোড়া, অঙ্গহীন, অসুস্থতাজনিত পেশাদার ভিক্ষুক তারা নয়। তাদের পুষ্টিহীন পাংশু অবয়বই বলে দেয় তারা দ্রব্যমূল্যের অসীম উল্লম্ফন, মূল্যস্ফীতি, মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমবর্ধিষ্ণু বেকারত্বের বিপরীতে উন্নয়নদর্পী সরকার সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্কট আর শোষণ-অভিঘাতের শিকার। জীবন ধারণে আবশ্যকীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির পাল্লায় পরাজিত মানুষ এরা। জিডিপি কিংবা মাথাপিছু গড় আয়, অর্থনৈতিক জটিল সমীকরণ তাদের কাছে দুর্বোধ্য। রাষ্ট্রযন্ত্র প্রচারিত অর্থনৈতিক উন্নয়নের নানা সূচকে ফেলে রাজধানীমুখী ভিক্ষুকের এই ঢলকে নিছক ‘সামাজিক ব্যধি’ হিসেবে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করবেন।কিন্তু পথে-ঘাটে, কাঁচাবাজার, শপিংমল, রাজধানীর যেকোনো পাবলিক প্লেস, বাস, ট্রেন, লঞ্চ টার্মিনাল, ফুটওভার ব্রিজ, ফলের দোকান, ট্রাফিক সিগন্যাল, মসজিদের প্রবেশদ্বার, অফিস, বাসাবাড়ি, পাড়া-মহল্লায় ভিক্ষুকদের উপস্থিতি বলে দেয় ভিক্ষাবৃত্তি বেড়েছে কতটা। রাজধানীতে এমন পথচারী কিংবা যানবাহন আরোহী নেই, যিনি দিনে কয়েকবার ভিক্ষুকের সামনে পড়েননি। তবে এই অবস্থাকে নেহায়েত ‘ভিক্ষুক সংক্রান্ত সামাজিক সঙ্কট’ বলতে নারাজ অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, দেশে চলছে প্রচ্ছন্ন দুর্ভিক্ষ। যারা হাত পাততে পারছে, তারাই ভিক্ষা করছে। কিন্তু যারা ৮ থেকে ১৪ হাজার টাকা মাসে আয় করছেন, তারা হাত পাততে পারছেন না। বোবা কান্নায় গুমরে মরছেন তারা।রাজধানীতে ভিক্ষুকের উৎপাত বেড়েছে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। জীবিকা নির্বাহের ব্যয়ভার বহন করতে না পারায় ভিক্ষুকের খাতায় নাম লেখাচ্ছে অনেক কর্মক্ষম নিম্ন আয়ের মানুষ, যা নগরীর সামাজিক সঙ্কটকেই শুধু তীব্রতর করেনিÑ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকেও নির্দেশ করছে। ভিক্ষুকের সংখ্যা নিরুপণে হালনাগাদ সমন্বিত কোনো জরিপ নেই। সর্বশেষ ২০২১ সালে তৎকালীন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী জাতীয় সংসদে জানিয়েছিলেন, দেশে ভিক্ষুকের সংখ্যা আড়াই লাখ। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ মানুষ ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত। কিন্তু বিভিন্ন সংস্থার জরিপ বলছে, প্রকৃত সংখ্যা ৩০ লাখেরও বেশি। এর মধ্যে শুধু রাজধানীতেই রয়েছে ৩ লাখের বেশি পেশাদার ভিক্ষুক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, বিগত বছরগুলোতে করোনার প্রভাবে শহর থেকে গ্রামে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে বেকারত্ব। মানুষের হাতে কাজ নেই। এর সঙ্গে হালের দ্রব্যমূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা এখন আর কোনো শুমারির মধ্যে নেই। কয়েক বছর আগে সরকারের পক্ষ থেকে দেশে বেকারত্বের হার ২১ শতাংশে নামিয়ে আনার দাবি করা হলেও বর্তমানে এখন বেকারত্ব ৪৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে। গার্মেন্টস শিল্পে রফতানি কমে গেছে। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কর্মহীন হয়ে পড়ছে দক্ষ শ্রমিকরাও। মাসে যারা ৮ থেকে ১৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করছে-তাদের মাঝে চলছে প্রচ্ছন্ন দুর্ভিক্ষ। এটিও ভিক্ষুক সৃষ্টি ও অপরাধীর সংখ্যা বাড়াচ্ছে।ভিক্ষাবৃত্তিতেও দুর্বৃত্তায়ন : নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যই শুধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে যায়নি। পেশাদার ভিক্ষুকদের ওপরও রয়েছে সিন্ডিকেটের থাবা। ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ ও নিরসনের পথে এই সিন্ডিকেটকে প্রধান বাধা মনে করছে সরকার। যে কারণেরভিক্ষুক পুনর্বাসনের নামে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলেও ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রণ হয়নি। দুর্নীতি আর কর্মকৌশলে ঘাটতি থাকার ফলে ভিক্ষুক নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে বরং বাড়ছে। একবার যিনি ভিক্ষাবৃত্তিতে নাম লেখায় তাকে আর এ পেশা থেকে ফেরানো যায় না। সরকারি এমন দাবির সপক্ষে মিলেছে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। যেমনÑ অন্য সাধারণ পেশা থেকে ভিক্ষাবৃত্তিতে তুলনামূলক আয় বেশি। ভিক্ষাবৃত্তি ‘পেশা’ হিসেবে স্বীকৃত না হলেও এটির ধর্মীয় ও সামাজিক ভিত্তি বেশ মজবুত। এ পেশায় ঝুঁকি নেই। পুঁজিও লাগে না। আত্মমর্যাদাবোধ এবং সামাজিক লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিয়ে হাত বাড়াতে পারলেই হাতে আসছে টাকা। দ্বিতীয়ত, হালের ভিক্ষাবৃত্তি চলে গেছে সিন্ডিকেটের হাতে। প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিয়ন্ত্রণ করছে ভিক্ষাবৃত্তি।