ঢাকা ০২:১৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ০৬ মার্চ ২০২৬, ২১ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পবিত্র মাহে রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে র‌্যাব-৮, পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে কোস্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যেগে ইফতার ও দোয়া মাহফিল।  মিডিল ইস্টে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার আহ্বান জনগণের সমর্থন নিয়ে ইউপি নির্বাচনে অংশ নিতে চান শ্রী মিশুক চন্দ্র ভুঁইয়া।  গণঅধিকার পরিষদে আনিসুর রহমান মুন্নার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার COAST Foundation সমৃদ্ধি কর্মসূচি পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকে এস এফ) এর সহায়তায় নাক,কান,গলা ও মেডিসিন বিষয়ক বিনামুল্যে স্বাস্থ‍্যক‍্যাম্প 2026 লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৭৫ কর্মী, হযরত শাহজালালে সহায়তা নিশ্চিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত Abdulla Ali AlHmoudi পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, এমপি’র সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। এক রাতে বিশ্বজুড়ে হাই কমিশন থেকে রাষ্ট্রপতির ছবি নামানো হয়: সাহাবুদ্দিন কেরানীগঞ্জে রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। সম্প্রতি কেরানীগঞ্জ মডেল থানার পরিত্যক্ত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলনের ঘটনার পর এবার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা 

শেষ পর্যন্ত সরতে যাচ্ছে কারওয়ান বাজার

স্টাফ রিপোর্টার :মেহেদী হাসান
  • নিউজ প্রকাশের সময় : ০২:৪৭:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ এপ্রিল ২০২৪ ১০৯ বার পড়া হয়েছে

প্রায় সাড়ে তিন শ বছর ধরে যে বাজারটি ক্রমেই ঢাকা শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা পেরিয়ে সেই বাজারটি সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। প্রাথমিক প্রক্রিয়া হিসেবে উত্তর সিটির আঞ্চলিক কার্যালয়টি এরই মধ্যে সরানোও হয়েছে। ওই ভবনে থাকা ১৭৬টি দোকান এবার সরিয়ে নেওয়া হবে গাবতলীতে। ডিএনসিসি বলছে, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবনটি ঈদুল ফিতরের পর ভেঙে ফেলা হবে।শহরের ঠিক মাঝে কাঁচাবাজার ও আড়তের অবস্থান দৃষ্টিকটূ, এই বাজার ও আড়ত গোটা এলাকায় যানজটের অন্যতম কারণ— এমন সব কারণ দেখিয়ে কারওয়ান বাজার সরানোর আলোচনা চলছিল দীর্ঘ দিন ধরেই। তারই ধারাবাহিকতায় বাজার সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে ডিএনসিসি। তবে ব্যবসায়ীরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না।ব্যবসায়ীরা বলছেন, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান যুক্ত এই বাজারের সঙ্গে, রয়েছে শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। জোর করে সরিয়ে দিলে তাদের রুটি-রুজিতেই টান পড়বে। একান্তই সরাতে হলে গাবতলীর বদলে তাদের যাত্রাবাড়ী স্থানান্তরের আর্জি তাদের।নগর পরিকল্পনাবিদরাও বলছেন, ইতিহাস-ঐতিহ্য তো বটেই, খাদ্যপণ্যের জন্য ঢাকার প্রায় সব শ্রেণির নাগরিকদের কাছেই কারওয়ান বাজার বিকল্পহীন। বাজারটি সংস্কারের মাধ্যমে এখানেই টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা না করে ঢাকার উপকণ্ঠে সরিয়ে নেওয়া হলে সরাসরি ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে।প্রায় সাড়ে তিন শ বছর আগে ১৬৭৯ সালে সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকার পান্ডু নদীর তীরে খাজা আম্বর মসজিদের দক্ষিণ দিকে বসতে শুরু করে ছোট্ট একটি বাজার। আশপাশের গ্রামের উৎপাদিত কৃষিপণ্য, বিশেষ করে শাক-সবজি, কামার-কুমোরদের গড়া তৈজসপত্র, প্রতিমা ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ে বণিক, মহাজন, মাঝি-মাল্লা, ক্রেতা-বিক্রেতারা আসতেন বাজারে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে লোকসমাগম, বাড়তে থাকে বাণিজ্যিক গুরুত্ব। একপর্যায়ে নবাব আহসানউল্লাহর ওয়াকফ করা জমিতে বাজারটি সম্প্রসারিত হয়। খুচরা বিক্রির পাশাপাশি পাইকারির ব্যবসা শুরু হলে সেই কারওয়ান বাজার পরিণত হয় ঢাকার প্রধান একটি মোকাম বা আড়তে।১৯০৫ সালে সম্প্রসারিত হতে থাকা নতুন ঢাকার বলতে গেলে কেন্দ্রে অবস্থান কারওয়ান বাজারের। মোগল আমলে পত্তন হওয়া বাজারটিকে ঘিরেই কালক্রমে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সংস্থার বাণিজ্যিক সদর দফতর, অফিস-আদালত, বিমা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল আর হোটেল-মোটেল। দেশের প্রধান প্রধান বেশ কিছু গণমাধ্যমের কার্যালয় এখানে।সেই বাজারটিই সরিয়ে ঢাকার অন্যতম প্রবেশপথ গাবতলী নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সিটি করপোরেশন, যে সিদ্ধান্তের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত ব্যবসায়ীদের। কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজার ক্ষুদ্র কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান চৌধুরী সুজন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই বাজার একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান যুক্ত। দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, মিনতিরা আছেন। তাদের অনেকেই এই বাজারের আশপাশে থাকেন। তাদের সন্তানরা এখানেই পড়ালেখা করে। আশপাশের এলাকার মানুষ এখানে বাজার করতে আসেন। এখান থেকে বাজার সরানো হলে বিরাট একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’কারওয়ান বাজারের চালের আড়ত। এখানে অনেক ব্যবসায়ীই রয়েছেন যারা তিন-চার দশক ধরে ব্যবসা করছেন। গাবতলীতে গেলে ব্যবসা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।কারওয়ান বাজার সরানোর এই ক্ষতিটা কেমন হবে— জানতে চাইলে সাইফুর রহমান বলেন, ‘বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন। শুধু আমাদের মার্কেটেই বছরে সাড়ে চার শ কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন হয়। বাজার স্থানান্তরে আমাদের মাত্র ২০ দিনের নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু আমাদের সারা দেশে যে পরিমাণ অর্থ লগ্নি করা আছে, সেটি তুলতেও তো সময় লাগবে। পাইকারদের কাছে বাকি আছে। এসব টাকার কী হবে— সেটি কেউ ভেবে দেখছে না।’প্রয়াত আনিসুল হক ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র থাকাকালে কারওয়ান বাজার সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়। ওই সময় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন, সরাতেই হলে তাদের যেন যাত্রাবাড়ী পাঠানো হয়। কারণ যাত্রাবাড়ীও একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু গাবতলী গেলে সম্পূর্ণ নতুন করে ব্যবসা তৈরি করতে হবে তাদের। গত রোববারও (৩১ মার্চ) তারা ডিএনসিসির বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলামের কাছে চিঠি দিয়েছেন তাদের দাবি-দাওয়া শোনার আহ্বান জানিয়ে। এখান থেকে অস্থায়ী দোকান ও টোলবাজার সরানোর যে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটিই যেন থাকে— এই দাবি তাদের।বিশেষত গাবতলী যেত না চাওয়ার কারণ জানিয়ে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী নেতা সাইফুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রথমত, গাবতলী অনেক দূরে। ঢাকার মধ্যে থাকা অন্য আড়তদার বা ক্রেতারা সেখানে যাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া গাবতলীয় এখনো প্রস্তুত না। আড়তের উপযোগী অবকাঠামেই নেই। এখানে একসঙ্গে চার থেকে পাঁচ শ ট্রাক ঢুকে মাল আনলোড করে বেরিয়ে যেতে পারে। ওখানে চার-পাঁচটা ট্রাকও ঢুকবে কি না, সন্দেহ। আমাদের বিষয়টি বিবেচনা করে সরকারের কাছে দাবি, দরকার হলে এই কারওয়ান বাজারই সংস্কার করে বহুতল মার্কেট করে দিক, যেন এই বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা কর্মসংস্থান ও জীবনযাপন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’একই দাবি কারওয়ান বাজারে থাকা কিচেন মার্কেটের ব্যবসায়ী, কাঁচাবাজার আড়তের দোকানদার ও পেঁয়াজ-আলুর আড়তদারদেরও। তারা বলছেন, এখান থেকে গাবতলী গেলে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। সরকার ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে এখানেই সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক ভবন করে দিতে পারে। ১০০ বছরের লিজ নিয়ে এখানে ব্যবসা করছেন তারা। ৩৫ বছরের মধ্যেই কীভাবে এসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়— সে প্রশ্ন তাদের।কারওয়ান বাজারের মাংসের দোকানগুলোর ক্রেতা রাজধানীর প্রায় এলাকার মানুষ। হাসপাতালের ক্যানটিন ও রেস্টুরেন্টগুলোতেও মাংস সরবরাহ করা হয় এসব দোকান থেকেই। এসব ক্রেতা গাবতলীতে যাবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন ব্যবসায়ীরা।কারওয়ান বাজার ঘিরে কর্মযজ্ঞে যুক্ত এসব হাজার হাজার মানুষের জীবনই কেবল নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনাতেও কারওয়ান বাজার সংস্কারের আহ্বান জানাচ্ছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘কারওয়ান বাজারের ঐতিহাসিক গুরত্বও আছে। ঢাকার একদম কেন্দ্রে এত বড় বাজার কিন্তু আর নেই। বাজার ঘিরেই পরে ব্যবসায়িক ভবনগুলো গড়ে উঠেছে। এখন ট্রাফিক জ্যাম, অসুন্দর, বিজনেস হাব করার দোহাই দিয়ে বাজার সরানোর কথা বলে হচ্ছে। কিন্তু আধুনিক ভবন তৈরি করে চাইলেই এগুলোর সমাধান করা যায়। আবার আড়ত গাবতলী স্থানান্তর করলেও কারওয়ান বাজার এলাকায় যানজট কমবে না। কারণ আশপাশের ভবনগুলোর অনেকগুলোরই পার্কিং সুবিধা না থাকায় রাস্তায় গাড়ি পার্ক করা থাকে।’কারওয়ান বাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘এই বাজার কিন্তু ঢাকার মতো উচ্চ মূল্যের শহরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ভরসার জায়গা। ঢাকার কেন্দ্রে হওয়ায় অন্যান্য জায়গা থেকেও এখান থেকেই কাঁচাবাজার ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করেন খুচরা বিক্রেতারা। এখন গাবতলী নিলে সেকেন্ডারি ট্রান্সপোর্ট যুক্ত হয়ে খরচ বেড়ে যাবে। বাড়বে জিনিসপত্রের দাম।সরকার শুধু ব্যবসায়ীদের কথা ভাবছে। কিন্তু ক্রয়সীমার বাইরে চলে যাওয়া এই নগরের সাধারণ মানুষের কথাও সরকারকে ভাবতে হবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

শেষ পর্যন্ত সরতে যাচ্ছে কারওয়ান বাজার

নিউজ প্রকাশের সময় : ০২:৪৭:৪০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ এপ্রিল ২০২৪

প্রায় সাড়ে তিন শ বছর ধরে যে বাজারটি ক্রমেই ঢাকা শহরের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে, দীর্ঘ জল্পনা-কল্পনা পেরিয়ে সেই বাজারটি সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। প্রাথমিক প্রক্রিয়া হিসেবে উত্তর সিটির আঞ্চলিক কার্যালয়টি এরই মধ্যে সরানোও হয়েছে। ওই ভবনে থাকা ১৭৬টি দোকান এবার সরিয়ে নেওয়া হবে গাবতলীতে। ডিএনসিসি বলছে, ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ভবনটি ঈদুল ফিতরের পর ভেঙে ফেলা হবে।শহরের ঠিক মাঝে কাঁচাবাজার ও আড়তের অবস্থান দৃষ্টিকটূ, এই বাজার ও আড়ত গোটা এলাকায় যানজটের অন্যতম কারণ— এমন সব কারণ দেখিয়ে কারওয়ান বাজার সরানোর আলোচনা চলছিল দীর্ঘ দিন ধরেই। তারই ধারাবাহিকতায় বাজার সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে ডিএনসিসি। তবে ব্যবসায়ীরা এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারছেন না।ব্যবসায়ীরা বলছেন, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান যুক্ত এই বাজারের সঙ্গে, রয়েছে শত কোটি টাকার বিনিয়োগ। জোর করে সরিয়ে দিলে তাদের রুটি-রুজিতেই টান পড়বে। একান্তই সরাতে হলে গাবতলীর বদলে তাদের যাত্রাবাড়ী স্থানান্তরের আর্জি তাদের।নগর পরিকল্পনাবিদরাও বলছেন, ইতিহাস-ঐতিহ্য তো বটেই, খাদ্যপণ্যের জন্য ঢাকার প্রায় সব শ্রেণির নাগরিকদের কাছেই কারওয়ান বাজার বিকল্পহীন। বাজারটি সংস্কারের মাধ্যমে এখানেই টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা না করে ঢাকার উপকণ্ঠে সরিয়ে নেওয়া হলে সরাসরি ভোক্তাদের ওপর এর প্রভাব পড়বে।প্রায় সাড়ে তিন শ বছর আগে ১৬৭৯ সালে সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকার পান্ডু নদীর তীরে খাজা আম্বর মসজিদের দক্ষিণ দিকে বসতে শুরু করে ছোট্ট একটি বাজার। আশপাশের গ্রামের উৎপাদিত কৃষিপণ্য, বিশেষ করে শাক-সবজি, কামার-কুমোরদের গড়া তৈজসপত্র, প্রতিমা ইত্যাদি নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য নিয়ে বণিক, মহাজন, মাঝি-মাল্লা, ক্রেতা-বিক্রেতারা আসতেন বাজারে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে লোকসমাগম, বাড়তে থাকে বাণিজ্যিক গুরুত্ব। একপর্যায়ে নবাব আহসানউল্লাহর ওয়াকফ করা জমিতে বাজারটি সম্প্রসারিত হয়। খুচরা বিক্রির পাশাপাশি পাইকারির ব্যবসা শুরু হলে সেই কারওয়ান বাজার পরিণত হয় ঢাকার প্রধান একটি মোকাম বা আড়তে।১৯০৫ সালে সম্প্রসারিত হতে থাকা নতুন ঢাকার বলতে গেলে কেন্দ্রে অবস্থান কারওয়ান বাজারের। মোগল আমলে পত্তন হওয়া বাজারটিকে ঘিরেই কালক্রমে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সংস্থার বাণিজ্যিক সদর দফতর, অফিস-আদালত, বিমা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল আর হোটেল-মোটেল। দেশের প্রধান প্রধান বেশ কিছু গণমাধ্যমের কার্যালয় এখানে।সেই বাজারটিই সরিয়ে ঢাকার অন্যতম প্রবেশপথ গাবতলী নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে সিটি করপোরেশন, যে সিদ্ধান্তের সঙ্গে তীব্র দ্বিমত ব্যবসায়ীদের। কারওয়ান বাজার কাঁচাবাজার ক্ষুদ্র কাঁচামাল আড়ত ব্যবসায়ী বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান চৌধুরী সুজন সারাবাংলাকে বলেন, ‘এই বাজার একদিনে গড়ে ওঠেনি। এর সঙ্গে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান যুক্ত। দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, মিনতিরা আছেন। তাদের অনেকেই এই বাজারের আশপাশে থাকেন। তাদের সন্তানরা এখানেই পড়ালেখা করে। আশপাশের এলাকার মানুষ এখানে বাজার করতে আসেন। এখান থেকে বাজার সরানো হলে বিরাট একটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’কারওয়ান বাজারের চালের আড়ত। এখানে অনেক ব্যবসায়ীই রয়েছেন যারা তিন-চার দশক ধরে ব্যবসা করছেন। গাবতলীতে গেলে ব্যবসা করতে পারবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন তারা।কারওয়ান বাজার সরানোর এই ক্ষতিটা কেমন হবে— জানতে চাইলে সাইফুর রহমান বলেন, ‘বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা ব্যাংকের হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন। শুধু আমাদের মার্কেটেই বছরে সাড়ে চার শ কোটি টাকার ব্যবসায়িক লেনদেন হয়। বাজার স্থানান্তরে আমাদের মাত্র ২০ দিনের নোটিশ দিয়েছে। কিন্তু আমাদের সারা দেশে যে পরিমাণ অর্থ লগ্নি করা আছে, সেটি তুলতেও তো সময় লাগবে। পাইকারদের কাছে বাকি আছে। এসব টাকার কী হবে— সেটি কেউ ভেবে দেখছে না।’প্রয়াত আনিসুল হক ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র থাকাকালে কারওয়ান বাজার সরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়। ওই সময় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছিলেন, সরাতেই হলে তাদের যেন যাত্রাবাড়ী পাঠানো হয়। কারণ যাত্রাবাড়ীও একটি ব্যবসায়িক কেন্দ্র হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু গাবতলী গেলে সম্পূর্ণ নতুন করে ব্যবসা তৈরি করতে হবে তাদের। গত রোববারও (৩১ মার্চ) তারা ডিএনসিসির বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলামের কাছে চিঠি দিয়েছেন তাদের দাবি-দাওয়া শোনার আহ্বান জানিয়ে। এখান থেকে অস্থায়ী দোকান ও টোলবাজার সরানোর যে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছিল, সেটিই যেন থাকে— এই দাবি তাদের।বিশেষত গাবতলী যেত না চাওয়ার কারণ জানিয়ে কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ী নেতা সাইফুর রহমান সারাবাংলাকে বলেন, ‘প্রথমত, গাবতলী অনেক দূরে। ঢাকার মধ্যে থাকা অন্য আড়তদার বা ক্রেতারা সেখানে যাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া গাবতলীয় এখনো প্রস্তুত না। আড়তের উপযোগী অবকাঠামেই নেই। এখানে একসঙ্গে চার থেকে পাঁচ শ ট্রাক ঢুকে মাল আনলোড করে বেরিয়ে যেতে পারে। ওখানে চার-পাঁচটা ট্রাকও ঢুকবে কি না, সন্দেহ। আমাদের বিষয়টি বিবেচনা করে সরকারের কাছে দাবি, দরকার হলে এই কারওয়ান বাজারই সংস্কার করে বহুতল মার্কেট করে দিক, যেন এই বাজার ঘিরে গড়ে ওঠা কর্মসংস্থান ও জীবনযাপন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।’একই দাবি কারওয়ান বাজারে থাকা কিচেন মার্কেটের ব্যবসায়ী, কাঁচাবাজার আড়তের দোকানদার ও পেঁয়াজ-আলুর আড়তদারদেরও। তারা বলছেন, এখান থেকে গাবতলী গেলে ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে হবে। সরকার ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে এখানেই সংস্কারের মাধ্যমে আধুনিক ভবন করে দিতে পারে। ১০০ বছরের লিজ নিয়ে এখানে ব্যবসা করছেন তারা। ৩৫ বছরের মধ্যেই কীভাবে এসব ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়— সে প্রশ্ন তাদের।কারওয়ান বাজারের মাংসের দোকানগুলোর ক্রেতা রাজধানীর প্রায় এলাকার মানুষ। হাসপাতালের ক্যানটিন ও রেস্টুরেন্টগুলোতেও মাংস সরবরাহ করা হয় এসব দোকান থেকেই। এসব ক্রেতা গাবতলীতে যাবেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছেন ব্যবসায়ীরা।কারওয়ান বাজার ঘিরে কর্মযজ্ঞে যুক্ত এসব হাজার হাজার মানুষের জীবনই কেবল নয়, ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনাতেও কারওয়ান বাজার সংস্কারের আহ্বান জানাচ্ছেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘কারওয়ান বাজারের ঐতিহাসিক গুরত্বও আছে। ঢাকার একদম কেন্দ্রে এত বড় বাজার কিন্তু আর নেই। বাজার ঘিরেই পরে ব্যবসায়িক ভবনগুলো গড়ে উঠেছে। এখন ট্রাফিক জ্যাম, অসুন্দর, বিজনেস হাব করার দোহাই দিয়ে বাজার সরানোর কথা বলে হচ্ছে। কিন্তু আধুনিক ভবন তৈরি করে চাইলেই এগুলোর সমাধান করা যায়। আবার আড়ত গাবতলী স্থানান্তর করলেও কারওয়ান বাজার এলাকায় যানজট কমবে না। কারণ আশপাশের ভবনগুলোর অনেকগুলোরই পার্কিং সুবিধা না থাকায় রাস্তায় গাড়ি পার্ক করা থাকে।’কারওয়ান বাজারের অর্থনৈতিক গুরুত্ব তুলে ধরে এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, ‘এই বাজার কিন্তু ঢাকার মতো উচ্চ মূল্যের শহরে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ভরসার জায়গা। ঢাকার কেন্দ্রে হওয়ায় অন্যান্য জায়গা থেকেও এখান থেকেই কাঁচাবাজার ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য সংগ্রহ করেন খুচরা বিক্রেতারা। এখন গাবতলী নিলে সেকেন্ডারি ট্রান্সপোর্ট যুক্ত হয়ে খরচ বেড়ে যাবে। বাড়বে জিনিসপত্রের দাম।সরকার শুধু ব্যবসায়ীদের কথা ভাবছে। কিন্তু ক্রয়সীমার বাইরে চলে যাওয়া এই নগরের সাধারণ মানুষের কথাও সরকারকে ভাবতে হবে।’