ঢাকা ১০:০৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ১১ মার্চ ২০২৬, ২৭ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
মানবসেবার অঙ্গীকার নিয়ে ট্রেনিং সেন্টারের পথে ডা. আব্দুল হালিম এসকে ভূমি সেবা দুর্নীতিমুক্ত রাখতে সবার প্রতি আহ্বান — মোঃ আলমগীর হোসেন পবিত্র মাহে রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার লক্ষ্যে র‌্যাব-৮, পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে কোস্ট ফাউন্ডেশনের উদ্যেগে ইফতার ও দোয়া মাহফিল।  মিডিল ইস্টে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সতর্ক থাকার আহ্বান জনগণের সমর্থন নিয়ে ইউপি নির্বাচনে অংশ নিতে চান শ্রী মিশুক চন্দ্র ভুঁইয়া।  গণঅধিকার পরিষদে আনিসুর রহমান মুন্নার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার COAST Foundation সমৃদ্ধি কর্মসূচি পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকে এস এফ) এর সহায়তায় নাক,কান,গলা ও মেডিসিন বিষয়ক বিনামুল্যে স্বাস্থ‍্যক‍্যাম্প 2026 লিবিয়া থেকে দেশে ফিরলেন ১৭৫ কর্মী, হযরত শাহজালালে সহায়তা নিশ্চিত সংযুক্ত আরব আমিরাতের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত Abdulla Ali AlHmoudi পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, এমপি’র সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন।

সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন এর নেপথ্য কাহিনী কিভাবে যুগান্তরে।

রিপোর্টার মোঃসিপন রানা
  • নিউজ প্রকাশের সময় : ১২:১৮:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০২৩ ১২২ বার পড়া হয়েছে

সময়টা ২০০৭ সাল। প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা। ২০০৭ সালের জুলাইয়ে বিশেষ কারণে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা থেকে থেকে পদত্যাগ করলাম। আমি ছিলাম বিশেষ সংবাদদাতা এবং চীফ রিপোর্টার। প্রায় ১০ বছর বাংলাবাজারে চাকুরি করার পর পদত্যাগ কেন করলাম সেই কাহিনী পরে বলবো। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রিয় বন্ধু চট্টগ্রামের শাহীন উল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাবাজার পত্রিকার কূটনৈতিক রিপোর্টার শাহীন চৌধুরী কতৃপক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়ায় এই পত্রিকা ছেড়ে টিভি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শাহীন চৌধুরী আমাকে প্রস্তাব দিল আর দৈনিক পত্রিকা নয়, টেলিভিশনে কাজ করবো। শাহিনের ভাষ্য অনুযায়ী বিএনপির সাবেক এক এমপির মালিকানাধীন দেশ টেলিভিশন এর মালিকানা পরিবর্তন হবে। সে চট্টগ্রামের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর নাম জানায় যিনি দেশ টিভির স্বত্ত্ব কিনতে আগ্রহী। এখন আমি উদ্যোগ নিলেই দেশ টিভি নিয়ে কাজ করা যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান ছিলেন দেশ টিভির মালিক। ছিলেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা। সেই সুযোগে দেশ টিভির লাইসেন্স নেন। এমডি নিয়োগ করেন তারই নিকটাত্মীয় আরিফুর রহমানকে। যিনি বর্তমানেও দেশ টিভির এমডি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারনে এমপি সাহেব টিভির মালিকানা পরিবর্তন করতে চাইছেন। না হলে বিপদে পড়ে যাবেন।
দেশ টিভির কাগজপত্র পরীক্ষা করলাম। অনেক অনিয়ম। অস্বচ্ছতা। তথ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ফাইল দেখে আঁতকে উঠলাম। সেই কাহিনী এখন বলতে চাই না। কিন্তু নামটি পছন্দ হওয়ায় আগ্রহী হলাম। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী (যিনি একজন
ব্যারিস্টার। আমাকে বড় ভাইয়ের মত শ্রদ্ধা করেন) আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত। তার বাবা চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্য। আমি কথা বললাম দেশ টিভির লাইসেন্সে থাকা এমডি আরিফুর রহমানের সাথে। তিনি গুলশানের এক কোরিয়ান রেস্টুরেন্টে ডিনারের আমন্ত্রন জানালেন। একটু মোটা গড়নের কম বয়সী আরিফুর রহমান খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাদের গ্রহন করলেন। দামি কোরিয়ান ফুড দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আরিফুর রহমানের সাথে কথাবার্তায় মনে হলো তিনি প্রচণ্ড চতুর, বাকপটু এবং মেধাবী।
অনেক বিষয়েই বিতর্ক হলো। শেষ পর্যন্ত তিনি রাজী হলেন। একটি বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে আমাদের কাছে মালিকানা হস্তান্তর করবেন। চুক্তির খসড়া তৈরির পর আবার বসবো। কিন্তু আরিফুর রহমানের দুটি শর্ত নিয়ে আপত্তি ছিল। একটি হচ্ছে, মালিকানা পরিবর্তনের পরও তাকেই দেশ টিভির এমডি রাখতে হবে এবং শাহীন চৌধুরীকে বাদ দিতে হবে। কথাবার্তাজনিত কারনে শাহীনকে তার পছন্দ হয়নি। আমরা পরবর্তী বৈঠকে এ নিয়ে কথা বলবো জানিয়ে চলে আসলাম।
দেশ টিভির মালিকানা কেনা হবে এ নিয়ে আমরা উদ্যোক্তারা চূড়ান্তভাবে একমত হলাম। পরে জানলাম মালিকানা নিয়েও ঘাপলা আছে। প্রখ্যাত চলচিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামই দেশ টিভির লাইসেন্সের জন্যে প্রথম আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার জোরে লাইসেন্স পান এমপি মুশফিকুর রহমান। সেই কাহিনী বলতে চাই না। তবে আমরা দেশ টিভি নামটি আকর্ষনীয় হওয়ায় এর মালিকানা কেনার সিদ্ধান্ত নেই। এরপর ব্যবসায়ী ব্যারিস্টারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, একটি লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হবে। দেশ মাল্টিমিডিয়া। যেখানে আমার এবং শাহীন চৌধুরীর মালিকানা থাকবে।
নতুন টিভির সম্প্রচার নিয়ে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ২০০৭ সালের শেষ দিকে দেশ এবং রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে সাবেক সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমেদ। তার এক ব্যবসায়ী ভাইয়ের সাথে আগে থেকেই ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। এখন সম্প্রচার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হবে। বিশাল বিনিয়োগ। সিদ্ধান্ত হলো সিংগাপুর যাব। ভিসার জন্যে আবেদন করেছি। ভিসা সংগ্রহের জন্যে গেলাম এম্বেসিতে। এমন সময় একটি ফোন আসলো। শ্রদ্ধেয় শাহজাহান সরদার। ইত্তেফাকের আলোচিত সাংবাদিক। তখন তিনি দৈনিক যুগান্তরের উপ সম্পাদক।
শাহজান সরদার ফোন করে জানতে চাইলেন হেলাল তুমি কোথায়? অনেকক্ষন তোমার ফোন বন্ধ ছিল। বললাম ভিসার জন্য এম্বাসিতে। তিনি বললেন, তুমি কি কোথাও জয়েন করেছ? বললাম নতুন দেশ টিভি নিয়ে কাজ করছি। তিনি সরাসরি জানতে চাইলেন দৈনিক যুগান্তরে কাজ করবে? এ প্রস্তাবে আমি তো অবাক! কারণ দৈনিক যুগান্তর সৃষ্টি হয়েছে বাংলাবাজার পত্রিকার কিছু রিপোর্ট এর কারনে। বাংলাবাজার পত্রিকার সাহসী মালিক জাকারিয়া খান যমুনা গ্রুপের হালাল সাবান নিয়ে প্রতারনা, আমদানি এবং উৎপাদনে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। আমি এবং নঈম নিজাম (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক) ধারাবাহিক নিউজ করেছি। এরমধ্যে ২টি রিপোর্ট নঈম নিজামের, ৭টি রিপোর্ট ছিল আমার। (এই কাহিনী পরে জানাব।) যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রথম পৃষ্টায় বিশাল বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিবাদ লিপি ছাপালেন। বাংলাবাজারের রিপোর্টের কারণে যমুনা গ্রুপের এরোমেটিক হালাল সাবানের ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। এরপরই যমুনা গ্রুপ নিজেরাই

সংবাদপত্র শিল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়।
যমুনা গ্রুপের একাধিক মামলায় আসামী আমি, নঈম নিজাম এবং সম্পাদক জাকারিয়া খান। সেই যুগান্তরে আমার চাকুরি হবে? অসম্ভব। শাহজাহান সরদার বললেন, তুমি কাল আমার সাথে দেখা করো। শাহজাহান ভাই ছিলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয়। খুবই স্নেহ করতেন। আমাকে ভালবাসতেন। ভাল রিপোর্টার হিসেবে জানতেন।

আমি সংবাদপত্রের মানুষ। সেই ১৯৮৪ সাল থেকে দৈনিক খবর দিয়ে আমার সাংবাদিকতার শুরু। বাংলাবাজার পত্রিকা ছেড়ে শাহীন চৌধুরীর পরামর্শেই টিভি সাংবাদিকতা শুরুর চিন্তা করেছিলাম। হাতের কাছে দেশ টিভির অপার পেয়ে তাই নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে লুফে নেই। এখন আবার দৈনিক পত্রিকায় কাজ করতে হবে? তাহলে টিভির কি হবে? তবে শাহজাহান সরদার ভাইকে এতই শ্রদ্ধা করতাম যে তার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলাম না।

পরদিন জীবনে প্রথমবারের মত দৈনিক যুগান্তর অফিসে ঢুকলাম। তখন মতিঝিলে একটি অস্থায়ী ভবনে দৈনিক যুগান্তরের কার্যালয়। খুবই জনপ্রিয় পত্রিকা। সার্কুলেশনে প্রথম আলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। পরে আবার সার্কুলেশন কমে যায়। শাহজাহান ভাইয়ের রুমে কথা বার্তাকালে প্রয়াত সাংবাদিক পীর হাবিব (বাংলাবাজারে আমার সাবেক কলিগ) আসলেন। একটু পর বিশেষ সংবাদদাতা মাহমুদ হাসান এলেন। (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিদিনের উপ-সম্পাদক)। তারা উভয়েই আমাকে আগে থেকে চিনতেন। ভাল জানতেন। এরপর শাহজাহান সরদার ভাই ফোন করলেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুলকে। কথা বার্তায় মনে হল আমার সম্পর্কে আগে থেকেই তিনি সবকিছু অবগত। পরদিন তিনি সময় দিলেন।
২০০৭ সালের শেষ দিক। মাসটা মনে নেই। যুগান্তরের সাবেক সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার প্রিয় বন্ধু ফখরুল ইসলাম কাঞ্চন তখন আমার দেশ পত্রিকায। এর আগেও সে যুগান্তরের ছিল। আবার যুগান্তরে জয়েন করবে। বেলা তখন প্রায় ১১ টা। আমরা দু’জন একসাথে ঢুকলাম মতিঝিলের সেনা কল্যান ভবনস্থ যমুনা গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে। চেয়ারম্যানের রুমে আগে থেকেই অপেক্ষা করছেন শাহজাহান সরদার ভাই। আমরা মুখোমুখি হলাম সে সময়ে তুমুল আলোচিত, বিতর্কিত ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বাবুলের। এটি তার আমার ২য় স্বাক্ষাৎ। প্রথমবার সাক্ষাৎ হয়ে ছিল দৈনিক মানবজমিনে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আবদুল হান্নানের হঠাৎ পদত্যাগের পেছনে নুরুল ইসলাম বাবুলের ভূমিকা নিয়ে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানাব।
বুক ধড়ফড় নিয়ে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যানের রুমে ঢুকলাম। তিনি খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাদের বসতে বললেন। শাহজাহান ভাই আমার সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন। তিনি বললেন, ওকে আমি জানি। এরপর কফি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আমি তখন ভয়ে ছিলাম। যার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এত নেগেটিভ নিউজ করেছি। তার মামলার আসামী হয়েছি। তিনি আমাকে কিভাবে নিবেন সেই ভয়ে ছিলাম। এ ছাড়া বাবুল সাহেবের ব্যবহার নিয়ে অনেক সমালোচনা ছিল। কিন্তু না। তিনি খুবই ভাল ব্যবহার করলেন। বললেন, আমার অনেক ক্ষতি করেছ। আমার হালাল সাবান নিয়ে অনেক নিউজ করেছ। মানবজমিন পত্রিকায়ও আমার বিরুদ্ধে নিউজ করার চেষ্টা করেছ। বললাম, আমি মিথ্যা রিপোর্ট করিনি। বাংলাবাজার পত্রিকা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী রিপোর্ট করতে বাধ্য। বাবুল সাহেব হাসলেন। (ঐ সময়ে যা তার স্বভাববিরুদ্ধ)। বললেন, ঠিক আছে অনেক ক্ষতি করেছ। এখন উপকার কর। আমি বললাম ন্যায়সংগত হলে যে কোন কাজ আমি করতে পারবো। তিনি বললেন, এনবিআরে আমার একটি ফাইল আটকে আছে। যুগান্তরের এক রিপোর্টারকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সে ব্যর্থ হয়েছে। কাজটি না হলে অনেক বড় সমস্যা হবে। আগামী ৭দিনের মধ্যে কাজটি করে দিতে পারবে?
শাহজাহান সরদার ভাই সাপোর্ট দিয়ে বললেন, পারলে একমাত্র হেলালই পারবে। তার প্রতি আমার আস্থা আছে। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। বাবুল সাহেব বললেন, ঠিক আছে হেলাল এবং কাঞ্চনকে বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ দাও। (যদিও যোগ দিয়েছি সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে। সেই কাহিনী পরে জানাব।) বিদায়কালে আবার বললেন, হেলাল। বাংলাবাজারে রিপোর্ট করে আমার ক্ষতি করেছ। এখন উপকার কর। আমি অনেক বড় ঝামেলায় আছি। এনবিআর অহেতুক হয়রানি করছে। কাজটি না হলে যমুনা গ্রুপের বড় ক্ষতি হবে। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম এবং বিদায় নিলাম। তিনি বললেন, কালকেই যুগান্তরে জয়েন কর। কিন্তু জয়েন করেছি আরও পরে। কারণ যুগান্তরে কর্মরত অনেকেই চাননি আমি যোগ দেই। তারা আমার বিরোধিতা করেছিলেন। যদিও বিরোধিতাকারী প্রত্যেকেই ছিলেন আমার পরিচিত এবং দুজন ছিলেন আমার নিজ জেলা চাঁদপুরের। তাদের এই হীন তৎপরতায় আহত, ক্ষুব্দ হয়ে ছিলাম।আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যুগান্তরে যোগ দেব না। তবে যেহেতু বাবুল সাহেবকে কথা দিয়েছি। নি:স্বার্থভাবে তার কাজটি আমি করে দেব। এ ছাড়া তিনি অতীত ভুলে অপ্রত্যাশিত আন্তরিক ব্যবহার করেছিলেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

ট্যাগস :

সাংবাদিক হেলাল উদ্দিন এর নেপথ্য কাহিনী কিভাবে যুগান্তরে।

নিউজ প্রকাশের সময় : ১২:১৮:১৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ জুলাই ২০২৩

সময়টা ২০০৭ সাল। প্রচণ্ড রাজনৈতিক অস্থিরতা। ২০০৭ সালের জুলাইয়ে বিশেষ কারণে দৈনিক বাংলাবাজার পত্রিকা থেকে থেকে পদত্যাগ করলাম। আমি ছিলাম বিশেষ সংবাদদাতা এবং চীফ রিপোর্টার। প্রায় ১০ বছর বাংলাবাজারে চাকুরি করার পর পদত্যাগ কেন করলাম সেই কাহিনী পরে বলবো। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ প্রিয় বন্ধু চট্টগ্রামের শাহীন উল ইসলাম চৌধুরী। বাংলাবাজার পত্রিকার কূটনৈতিক রিপোর্টার শাহীন চৌধুরী কতৃপক্ষের সাথে বনিবনা না হওয়ায় এই পত্রিকা ছেড়ে টিভি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। শাহীন চৌধুরী আমাকে প্রস্তাব দিল আর দৈনিক পত্রিকা নয়, টেলিভিশনে কাজ করবো। শাহিনের ভাষ্য অনুযায়ী বিএনপির সাবেক এক এমপির মালিকানাধীন দেশ টেলিভিশন এর মালিকানা পরিবর্তন হবে। সে চট্টগ্রামের এক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীর নাম জানায় যিনি দেশ টিভির স্বত্ত্ব কিনতে আগ্রহী। এখন আমি উদ্যোগ নিলেই দেশ টিভি নিয়ে কাজ করা যায়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য মুশফিকুর রহমান ছিলেন দেশ টিভির মালিক। ছিলেন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা। সেই সুযোগে দেশ টিভির লাইসেন্স নেন। এমডি নিয়োগ করেন তারই নিকটাত্মীয় আরিফুর রহমানকে। যিনি বর্তমানেও দেশ টিভির এমডি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের কারনে এমপি সাহেব টিভির মালিকানা পরিবর্তন করতে চাইছেন। না হলে বিপদে পড়ে যাবেন।
দেশ টিভির কাগজপত্র পরীক্ষা করলাম। অনেক অনিয়ম। অস্বচ্ছতা। তথ্য মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ফাইল দেখে আঁতকে উঠলাম। সেই কাহিনী এখন বলতে চাই না। কিন্তু নামটি পছন্দ হওয়ায় আগ্রহী হলাম। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী (যিনি একজন
ব্যারিস্টার। আমাকে বড় ভাইয়ের মত শ্রদ্ধা করেন) আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত। তার বাবা চট্টগ্রামের জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী সংসদ সদস্য। আমি কথা বললাম দেশ টিভির লাইসেন্সে থাকা এমডি আরিফুর রহমানের সাথে। তিনি গুলশানের এক কোরিয়ান রেস্টুরেন্টে ডিনারের আমন্ত্রন জানালেন। একটু মোটা গড়নের কম বয়সী আরিফুর রহমান খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাদের গ্রহন করলেন। দামি কোরিয়ান ফুড দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আরিফুর রহমানের সাথে কথাবার্তায় মনে হলো তিনি প্রচণ্ড চতুর, বাকপটু এবং মেধাবী।
অনেক বিষয়েই বিতর্ক হলো। শেষ পর্যন্ত তিনি রাজী হলেন। একটি বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে আমাদের কাছে মালিকানা হস্তান্তর করবেন। চুক্তির খসড়া তৈরির পর আবার বসবো। কিন্তু আরিফুর রহমানের দুটি শর্ত নিয়ে আপত্তি ছিল। একটি হচ্ছে, মালিকানা পরিবর্তনের পরও তাকেই দেশ টিভির এমডি রাখতে হবে এবং শাহীন চৌধুরীকে বাদ দিতে হবে। কথাবার্তাজনিত কারনে শাহীনকে তার পছন্দ হয়নি। আমরা পরবর্তী বৈঠকে এ নিয়ে কথা বলবো জানিয়ে চলে আসলাম।
দেশ টিভির মালিকানা কেনা হবে এ নিয়ে আমরা উদ্যোক্তারা চূড়ান্তভাবে একমত হলাম। পরে জানলাম মালিকানা নিয়েও ঘাপলা আছে। প্রখ্যাত চলচিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামই দেশ টিভির লাইসেন্সের জন্যে প্রথম আবেদন করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার জোরে লাইসেন্স পান এমপি মুশফিকুর রহমান। সেই কাহিনী বলতে চাই না। তবে আমরা দেশ টিভি নামটি আকর্ষনীয় হওয়ায় এর মালিকানা কেনার সিদ্ধান্ত নেই। এরপর ব্যবসায়ী ব্যারিস্টারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, একটি লিমিটেড কোম্পানি গঠন করা হবে। দেশ মাল্টিমিডিয়া। যেখানে আমার এবং শাহীন চৌধুরীর মালিকানা থাকবে।
নতুন টিভির সম্প্রচার নিয়ে আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। ২০০৭ সালের শেষ দিকে দেশ এবং রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে সাবেক সেনা প্রধান মঈন ইউ আহমেদ। তার এক ব্যবসায়ী ভাইয়ের সাথে আগে থেকেই ঘনিষ্ঠতা ছিল। তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। এখন সম্প্রচার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে হবে। বিশাল বিনিয়োগ। সিদ্ধান্ত হলো সিংগাপুর যাব। ভিসার জন্যে আবেদন করেছি। ভিসা সংগ্রহের জন্যে গেলাম এম্বেসিতে। এমন সময় একটি ফোন আসলো। শ্রদ্ধেয় শাহজাহান সরদার। ইত্তেফাকের আলোচিত সাংবাদিক। তখন তিনি দৈনিক যুগান্তরের উপ সম্পাদক।
শাহজান সরদার ফোন করে জানতে চাইলেন হেলাল তুমি কোথায়? অনেকক্ষন তোমার ফোন বন্ধ ছিল। বললাম ভিসার জন্য এম্বাসিতে। তিনি বললেন, তুমি কি কোথাও জয়েন করেছ? বললাম নতুন দেশ টিভি নিয়ে কাজ করছি। তিনি সরাসরি জানতে চাইলেন দৈনিক যুগান্তরে কাজ করবে? এ প্রস্তাবে আমি তো অবাক! কারণ দৈনিক যুগান্তর সৃষ্টি হয়েছে বাংলাবাজার পত্রিকার কিছু রিপোর্ট এর কারনে। বাংলাবাজার পত্রিকার সাহসী মালিক জাকারিয়া খান যমুনা গ্রুপের হালাল সাবান নিয়ে প্রতারনা, আমদানি এবং উৎপাদনে অস্বচ্ছতা, অনিয়ম বিষয়ে সোচ্চার ছিলেন। আমি এবং নঈম নিজাম (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক) ধারাবাহিক নিউজ করেছি। এরমধ্যে ২টি রিপোর্ট নঈম নিজামের, ৭টি রিপোর্ট ছিল আমার। (এই কাহিনী পরে জানাব।) যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রথম পৃষ্টায় বিশাল বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতিবাদ লিপি ছাপালেন। বাংলাবাজারের রিপোর্টের কারণে যমুনা গ্রুপের এরোমেটিক হালাল সাবানের ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। এরপরই যমুনা গ্রুপ নিজেরাই

সংবাদপত্র শিল্পে বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়।
যমুনা গ্রুপের একাধিক মামলায় আসামী আমি, নঈম নিজাম এবং সম্পাদক জাকারিয়া খান। সেই যুগান্তরে আমার চাকুরি হবে? অসম্ভব। শাহজাহান সরদার বললেন, তুমি কাল আমার সাথে দেখা করো। শাহজাহান ভাই ছিলেন আমার পরম শ্রদ্ধেয়। খুবই স্নেহ করতেন। আমাকে ভালবাসতেন। ভাল রিপোর্টার হিসেবে জানতেন।

আমি সংবাদপত্রের মানুষ। সেই ১৯৮৪ সাল থেকে দৈনিক খবর দিয়ে আমার সাংবাদিকতার শুরু। বাংলাবাজার পত্রিকা ছেড়ে শাহীন চৌধুরীর পরামর্শেই টিভি সাংবাদিকতা শুরুর চিন্তা করেছিলাম। হাতের কাছে দেশ টিভির অপার পেয়ে তাই নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে লুফে নেই। এখন আবার দৈনিক পত্রিকায় কাজ করতে হবে? তাহলে টিভির কি হবে? তবে শাহজাহান সরদার ভাইকে এতই শ্রদ্ধা করতাম যে তার অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলাম না।

পরদিন জীবনে প্রথমবারের মত দৈনিক যুগান্তর অফিসে ঢুকলাম। তখন মতিঝিলে একটি অস্থায়ী ভবনে দৈনিক যুগান্তরের কার্যালয়। খুবই জনপ্রিয় পত্রিকা। সার্কুলেশনে প্রথম আলোকেও ছাড়িয়ে গেছে। পরে আবার সার্কুলেশন কমে যায়। শাহজাহান ভাইয়ের রুমে কথা বার্তাকালে প্রয়াত সাংবাদিক পীর হাবিব (বাংলাবাজারে আমার সাবেক কলিগ) আসলেন। একটু পর বিশেষ সংবাদদাতা মাহমুদ হাসান এলেন। (বর্তমানে বাংলাদেশ প্রতিদিনের উপ-সম্পাদক)। তারা উভয়েই আমাকে আগে থেকে চিনতেন। ভাল জানতেন। এরপর শাহজাহান সরদার ভাই ফোন করলেন যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুলকে। কথা বার্তায় মনে হল আমার সম্পর্কে আগে থেকেই তিনি সবকিছু অবগত। পরদিন তিনি সময় দিলেন।
২০০৭ সালের শেষ দিক। মাসটা মনে নেই। যুগান্তরের সাবেক সিনিয়র ক্রাইম রিপোর্টার প্রিয় বন্ধু ফখরুল ইসলাম কাঞ্চন তখন আমার দেশ পত্রিকায। এর আগেও সে যুগান্তরের ছিল। আবার যুগান্তরে জয়েন করবে। বেলা তখন প্রায় ১১ টা। আমরা দু’জন একসাথে ঢুকলাম মতিঝিলের সেনা কল্যান ভবনস্থ যমুনা গ্রুপের প্রধান কার্যালয়ে। চেয়ারম্যানের রুমে আগে থেকেই অপেক্ষা করছেন শাহজাহান সরদার ভাই। আমরা মুখোমুখি হলাম সে সময়ে তুমুল আলোচিত, বিতর্কিত ব্যবসায়ী নুরুল ইসলাম বাবুলের। এটি তার আমার ২য় স্বাক্ষাৎ। প্রথমবার সাক্ষাৎ হয়ে ছিল দৈনিক মানবজমিনে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আবদুল হান্নানের হঠাৎ পদত্যাগের পেছনে নুরুল ইসলাম বাবুলের ভূমিকা নিয়ে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত জানাব।
বুক ধড়ফড় নিয়ে যমুনা গ্রুপের চেয়ারম্যানের রুমে ঢুকলাম। তিনি খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাদের বসতে বললেন। শাহজাহান ভাই আমার সম্পর্কে বিস্তারিত জানালেন। তিনি বললেন, ওকে আমি জানি। এরপর কফি দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। আমি তখন ভয়ে ছিলাম। যার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এত নেগেটিভ নিউজ করেছি। তার মামলার আসামী হয়েছি। তিনি আমাকে কিভাবে নিবেন সেই ভয়ে ছিলাম। এ ছাড়া বাবুল সাহেবের ব্যবহার নিয়ে অনেক সমালোচনা ছিল। কিন্তু না। তিনি খুবই ভাল ব্যবহার করলেন। বললেন, আমার অনেক ক্ষতি করেছ। আমার হালাল সাবান নিয়ে অনেক নিউজ করেছ। মানবজমিন পত্রিকায়ও আমার বিরুদ্ধে নিউজ করার চেষ্টা করেছ। বললাম, আমি মিথ্যা রিপোর্ট করিনি। বাংলাবাজার পত্রিকা কর্তৃপক্ষের নির্দেশ অনুযায়ী রিপোর্ট করতে বাধ্য। বাবুল সাহেব হাসলেন। (ঐ সময়ে যা তার স্বভাববিরুদ্ধ)। বললেন, ঠিক আছে অনেক ক্ষতি করেছ। এখন উপকার কর। আমি বললাম ন্যায়সংগত হলে যে কোন কাজ আমি করতে পারবো। তিনি বললেন, এনবিআরে আমার একটি ফাইল আটকে আছে। যুগান্তরের এক রিপোর্টারকে দায়িত্ব দিয়েছিলাম। সে ব্যর্থ হয়েছে। কাজটি না হলে অনেক বড় সমস্যা হবে। আগামী ৭দিনের মধ্যে কাজটি করে দিতে পারবে?
শাহজাহান সরদার ভাই সাপোর্ট দিয়ে বললেন, পারলে একমাত্র হেলালই পারবে। তার প্রতি আমার আস্থা আছে। আমি দায়িত্ব নিচ্ছি। বাবুল সাহেব বললেন, ঠিক আছে হেলাল এবং কাঞ্চনকে বিশেষ সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ দাও। (যদিও যোগ দিয়েছি সিনিয়র সাংবাদিক হিসেবে। সেই কাহিনী পরে জানাব।) বিদায়কালে আবার বললেন, হেলাল। বাংলাবাজারে রিপোর্ট করে আমার ক্ষতি করেছ। এখন উপকার কর। আমি অনেক বড় ঝামেলায় আছি। এনবিআর অহেতুক হয়রানি করছে। কাজটি না হলে যমুনা গ্রুপের বড় ক্ষতি হবে। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম এবং বিদায় নিলাম। তিনি বললেন, কালকেই যুগান্তরে জয়েন কর। কিন্তু জয়েন করেছি আরও পরে। কারণ যুগান্তরে কর্মরত অনেকেই চাননি আমি যোগ দেই। তারা আমার বিরোধিতা করেছিলেন। যদিও বিরোধিতাকারী প্রত্যেকেই ছিলেন আমার পরিচিত এবং দুজন ছিলেন আমার নিজ জেলা চাঁদপুরের। তাদের এই হীন তৎপরতায় আহত, ক্ষুব্দ হয়ে ছিলাম।আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যুগান্তরে যোগ দেব না। তবে যেহেতু বাবুল সাহেবকে কথা দিয়েছি। নি:স্বার্থভাবে তার কাজটি আমি করে দেব। এ ছাড়া তিনি অতীত ভুলে অপ্রত্যাশিত আন্তরিক ব্যবহার করেছিলেন।